Today 14 Aug 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

হুমায়ুন আহমেদ এর সাক্ষাৎকার সমগ্র – “সংগ্রহ-১৬”

লিখেছেন: আনোয়ার জাহান ঐরি | তারিখ: ৩০/০৭/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1287বার পড়া হয়েছে।

হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে  ইমদাদুল হক মিলনের একটি লেখা আছে, নাম – হুমায়ূন আহমেদ এবং হুমায়ূন আহমেদ। লেখাটিতে হুমায়ুন আহমেদ এর সাক্ষাৎকার এর সাথে সাথে বেশ কিছু মজাদার হাসি তামাশাও চলে এসেছে যাতে হুমায়ুন আহমেদের চির হাস্যমুখর প্রানবন্ত অনুভুতিও ফুটে উঠেছে। আগের পর্বে কিছু অংশ  ছিল। আজ আবার কিছু তুলে দিলাম।

 

 

এবার অন্য প্রসঙ্গে। মনে আছে, হুমায়ূন ভাইয়ের আজিমপুরের বাসায়ই মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তখন তিনি আমেরিকায় থাকেন। ছুটিতে দেশে এসেছেন। আমি মুহম্মদ জাফর ইকবালেরও ভক্ত পাঠক। যত দূর জানি, তখন পর্যন্ত তাঁর দুটি মাত্র বই বেরিয়েছে। মুক্তধারা থেকে ‘কপোট্রনিক সুখ দুঃখ’, শিশু একাডেমী থেকে ‘দিপু নাম্বার টু’। ‘কপোট্রনিক সুখ দুঃখ’ গল্পটি বিচিত্রায় ছাপা হয়েছিল এবং আজকের অনেক পাঠকই জানেন না, হুমায়ূন ভাইয়ের ‘নন্দিত নরকে’র প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন দুজন শিল্পী_মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও শামিম সিকদার।

হুমায়ূন আহমেদরা তিন ভাইই বিখ্যাত, তিন ভাইই লেখক। জনপ্রিয়তায় হুমায়ূন ভাইয়ের পরই জাফর ভাই। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো প্রিয় লেখক আর কেউ নেই। শিক্ষক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয় তিনি। স্কুল-কলেজের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আদর্শ, অসম্ভব সাহসী এবং সৎমানুষ। যে কজন মানুষের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে আমাদের সময়, মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁদের একজন।

আর আহসান হাবিব ‘উন্মাদ’ পত্রিকার সম্পাদক, দুর্দান্ত কার্টুন আঁকেন, রম্য লেখায় তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তাঁর জোকসের বইয়ের যে বিক্রি বইমেলায় আমি দেখেছি, বিস্ময়কর! এই পরিবারের আরেকজন মানুষের আমি খুব ভক্ত, হুমায়ূন ভাইয়ের মা। সারা দিন বই পড়েন, সাহিত্য নিয়ে ভাবেন। ‘নূরজাহান’ প্রথম পর্ব পড়ে আমাকে বললেন, দ্বিতীয় পর্ব বেরোলে আমাকে দিয়ো। দ্বিতীয় পর্ব বেরোতে সাত বছর লাগল। এই সাত বছরে যতবার দেখা হয়েছে, ততবারই তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, বেরোয়নি?

বই বেরোনোর পর প্রথম কপিটি আমি তাঁকে পেঁৗছে দিয়ে এসেছি। শেষ পর্ব হুমায়ূন ভাই মাকে কিনে দিয়েছিলেন, বইটা পেঁৗছে দিতে আমার কয়েকটা দিন দেরি হয়েছিল বলে।

আজিমপুরের সেই বাসা ছেড়ে হুমায়ূন ভাই তারপর এসে উঠলেন শহীদুল্লাহ্ হলের হাউস টিউটরের কোয়ার্টারে। তত দিনে অনিন্দ্য পাবলিশার্স নামের একটি প্রকাশন সংস্থা বেশ জাঁকজমক করে এসেছে প্রকাশনায়। হুমায়ূন ভাইয়ের ‘অমানুষ’, আমার ‘কালাকাল’_এই সব বই নিয়ে শুরু করল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অনিন্দ্যর স্বত্বাধিকারী নাজমুল হক একদিন একটা মিষ্টির প্যাকেট আর একটা নতুন সাদা ডাইহাটসু গাড়ি নিয়ে হুমায়ূন ভাইয়ের বাড়িতে এসে হাজির। গাড়িটা আপনার জন্য। রয়ালটি থেকে অ্যাডজাস্ট হবে।

ঘটনাটি অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশের কোনো লেখকের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা আগে বা পরে আজ পর্যন্ত আর ঘটেনি।

সেই সময় ‘দৈনিক বাংলা’র সাহিত্য পাতায় ‘মৌনব্রত’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলেন হুমায়ূন ভাই। ধারাবাহিকভাবে লেখা তাঁর বেশির ভাগ উপন্যাসই শেষ পর্যন্ত শেষ হয় না। ‘মৌনব্রত’ও শেষ হলো না। পরে এই লেখাটি নাম বদলে বই করলেন তিনি। ‘জনম জনম’। উপন্যাসটি যাঁরা পড়েছেন তাঁরা স্বীকার করবেন, ‘জনম জনম’ এক অসাধারণ উপন্যাস। পরে ‘নিরন্তর’ নামে আবু সায়িদ ছবি করেছেন। নায়িকা শাবনূর।

আমি হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সব উপন্যাস পড়েছি। বহু ভালো উপন্যাস লিখেছেন তিনি। কতগুলোর নাম বলব! ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’_এ দুটো উপন্যাস তো ইতিহাস! তারপর ‘নির্বাসন’, ‘সূর্যের দিন’, ‘অন্ধকারের গান’, ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’, ‘গৌরিপুর জংসন’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘কবি’, ‘উনিশ শো একাত্তর’, ‘ফেরা’, ‘জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘রুমালি’, ‘শুভ্র’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘বাদশানামদার’_আরো কত উপন্যাস! তাঁর লেখার একনিষ্ঠ পাঠক ও ভক্ত ছিলেন বাংলাদেশের খুব বড় একজন শিক্ষিত মানুষ, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। বেশ কয়েকবার হুমায়ূন ভাই আমাকে রাজ্জাক স্যারের ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টারে নিয়ে গেছেন। মনে আছে, রাজ্জাক স্যার নিজ হাতে পাঙাস মাছের ডিম রান্না করে আমাদের দুজনকে একদিন খাইয়েছিলেন। তাঁর মুখে কী যে প্রশংসা শুনেছি হুমায়ুন ভাইয়ের একেকটি লেখার!

একবার বইমেলায় আবু হেনা মুস্তাফা কামাল বললেন, হুমায়ূন মধ্যবিত্তের নাড়ি স্পর্শ করেছে। তাঁর ‘চোখ’ গল্পটি পড়ে ‘সংবাদ’-এ দুর্দান্ত একটি লেখা লিখলেন সৈয়দ শামসুল হক। ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’ উপন্যাসটি পড়ে আহমদ ছফা আমাকে বলেছিলেন, অসাধারণ লেখা! মাত্র কময়কটি আঁচড়ে বাংলাদেশের চেহারা ফুটিয়ে তুলেছে হুমায়ূন। ফরহাদ মযহার বলেছিলেন, হুমায়ূনের গল্পগুলোর কোনো তুলনা হয় না। নির্মলেন্দু গুণ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর ‘জলিল সাহেবের পিটিসন’ গল্পটি পড়ে। কলকাতার ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় হুমায়ূন ভাইয়ের ‘১৯৭১’ গল্পটি ছাপা হলো। আমার সামনে সেই গল্পের এমন প্রশংসা করলেন আল মাহমুদ, হুমায়ূন ভাই লজ্জা পেয়ে গেলেন।

এ রকম কত ঘটনার কথা লিখব!

একই হাতে কত রকমের লেখা যে লিখেছেন হুমায়ূন ভাই। বাংলা ভাষায় সায়েন্স ফিকশনের জনক তিনি। প্রথম সার্থক সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন, সায়েন্স ফিকশনকে জনপ্রিয় করেছেন। এখন তাঁর অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশনও ভীষণ জনপ্রিয়। ভূতের গল্পে হুমায়ূন আহমেদের কোনো জুড়ি নেই। তাঁর মতো এত ভালো ভূতের গল্প বাংলা ভাষার আর কোনো লেখক লেখেননি। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘ছায়াসঙ্গী’ গল্পটির কথা। রহস্য, ফ্যান্টাসি, থ্রিলার আর অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয়ের লেখা। ‘দেবী’, ‘নিশীথিনী’ লিখে আরেকটা জগৎ তৈরি করলেন। ‘অন্য ভুবন’ লিখে আরেকটি জগৎ তৈরি করলেন। ‘আয়নাঘর’, ‘পোকা’, ‘ভয়’_কত লেখার কথা বলব! আর তাঁর সেই অবিস্মরণীয় চরিত্র মিসির আলী, তুমুল জনপ্রিয় চরিত্র হিমু! সিলেটের একটি মেয়ে হিমুর সঙ্গেও আমার একবার দেখা হয়েছিল। সব মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদ একটি নেশার নাম, হুমায়ূন আহমেদ একটি প্রতিষ্ঠান। শিশু-কিশোরদের লেখা, রূপকথা_কোথায় তাঁর হাতের পরশ পড়েনি? আর যেখানে পড়েছে, সেখানেই সোনা ফলেছে। বাংলা ভাষায় তাঁর প্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ বলে যেতে পারেন। বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক, সতীনাথ ভাদুড়ীর উপন্যাস-গল্প তাঁর প্রিয়। জন স্টাইনবেক, স্টিফান কিং তাঁর প্রিয়। সারাক্ষণ লেখা নিয়ে ভাবছেন। লেখার ব্যাপারে অসম্ভব খুঁতখুঁতে। মনমতো না হলে সেই লেখা কিছুতেই লিখবেন না। মাথা ভর্তি নতুন নতুন আইডিয়া। সবার মধ্যে থেকেও, তুমুল আড্ডার মধ্যে থেকেও কোন ফাঁকে যেন একা হয়ে যান, লেখার জগতে চলে যান। যখন-তখন লিখতে পারেন। লেখেন মেঝেতে বসে, লেখার জন্য চেয়ার-টেবিল দরকার হয় না। লেখার মতোই অসম্ভব আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে গল্প বলতে পারেন, বাস্তবের সঙ্গে কোথায় যে মিশেল দেবেন কল্পনা, তিনি নিজে ছাড়া কেউ তা বুঝতে পারবে না। কখনো তিনি নিজেই মিসির আলী, কখনো হিমু। সব মিলিয়ে এক বিস্ময়কর মানুষ। কাউকে মা-বাবা ডাকতে পারেন না। নিজের শ্বশুর-শাশুড়িকেও কখনো মা কিংবা বাবা বলে ডাকেন না। কাউকে দুঃখ দিতে চাইলে বেশ ভালোভাবেই তা দিতে পারেন। নিজের নাটকে একবার এক বিশাল নাট্যব্যক্তিত্বের অভিনয় দেখে এত বিরক্ত হলেন, বললেন, ‘এটা কি অভিনয়? আরে, আপনি তো অভিনয়ই জানেন না।’ একবার তাঁর নুহাশপল্লীতে নাটকের রেকর্ডিংয়ে এসে সন্ধ্যার পর কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী অন্য একটি ঘরে বসে হুমায়ূন আহমেদের তুমুল নিন্দামন্দ করছেন। তিনি তো আর তা জানেন না, খুবই উৎফুল্ল ভঙ্গিতে সেই ঘরের দিকে যাচ্ছেন। ঘরের কাছে গিয়েই শোনেন, এই অবস্থা। বাইরে দাঁড়িয়ে খানিক ওসব শুনে মন খারাপ করে ফিরে এলেন। সেই সব অভিনেতা-অভিনেত্রীকে বুঝতে দিলেন না কিছু। আবার পেটে কথাও রাখতে পারেন না। যদি বন্ধুদের কেউ কোনো গোপন কথা বলে বলল, কাউকে বলবেন না, সেটাই সবার আগে বলে ফেলবেন। পাগলের সাঁকো নাড়ানোর  মতো।

১,৪৩৪ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৫৪ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৮০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৭-০২ ১১:৫৫:৩৪ মিনিটে
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    বাকী অংশটুকু পড়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম।

  2. এ হুসাইন মিন্টু মন্তব্যে বলেছেন:

    আপনার সবগুলো পোস্টই আমি পড়েছি, হুমায়ুন স্যারের সাক্ষাতকার সমূহ অনেক বেশি ভালো লেগেছে

  3. আরিফুর রহমান মন্তব্যে বলেছেন:

    হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাতকার পরে অনেক কিছু জানতে পারলাম।

  4. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    সাক্ষাতকারটি ভাল লাগল ।

  5. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    অনেক ভাল লাগল। সবগুলো পর্বই পড়ব আশা করছি।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top