Today 14 Aug 2022
banner
নোটিশ
ব্লগিং করুন আর জিতে নিন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের রিটার্ন বিমান টিকেট! প্রত্যেক প্রদায়কই এটি জিতে নিতে পারেন। আরও আছে সম্মানী ও ক্রেস্ট!
banner

হুমায়ুন আহমেদ এর সাক্ষাৎকার সমগ্র – “সংগ্রহ-১৭”

লিখেছেন: আনোয়ার জাহান ঐরি | তারিখ: ৩১/০৭/২০১৩

এই লেখাটি ইতিমধ্যে 1264বার পড়া হয়েছে।

হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে  ইমদাদুল হক মিলনের একটি লেখা আছে, নাম – হুমায়ূন আহমেদ এবং হুমায়ূন আহমেদ। লেখাটিতে হুমায়ুন আহমেদ এর সাক্ষাৎকার এর সাথে সাথে বেশ কিছু মজাদার হাসি তামাশাও চলে এসেছে যাতে হুমায়ুন আহমেদের চির হাস্যমুখর প্রানবন্ত অনুভুতিও ফুটে উঠেছে। আগের পর্বে কিছু অংশ  ছিল। আজ আবার কিছু তুলে দিলাম।

 

ইমদাদুল হক মিলন : বাংলা ভাষার খুব জনপ্রিয় লেখক হচ্ছেন শরৎচন্দ্র, তারপর তারাশঙ্কর। কিন্তু যে অর্থে জনপ্রিয়তাকে আমাদের দেশে বিবেচনা করা হয়, এঁরা সেই স্তরের লেখক না এবং আমরা সেই সারিতে আপনাকে অনেক আগেই যুক্ত করেছি। আপনার কি মনে হয়?

হুমায়ূন আহমেদ : আমার কিছু মনে হয় না, মিলন। আমি এটা আগেও বলেছি। তবে শোনো, আমাদের দেশের লেখকদের ভাগ্য খুবই খারাপ। শুধু লেখালেখি করে আমাদের লেখকরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন না। সেখানে আমার যে অবস্থানটা হয়েছে, মাঝেমধ্যে আমার কাছে খুবই বিস্ময়কর মনে হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন অধ্যাপনা করি, মাসে ছয় হাজার-সাড়ে ছয় হাজার টাকা পাই, থাকি শহীদুল্লাহ হলে। হঠাৎ করে দেখলাম, লোকজন আমার বই পড়া শুরু করেছে। আমি কী করলাম? মাথা খারাপ থাকলে যা হয় আর কি! সব কিছু বাদ দিয়ে একটা গাড়ি কিনে ফেললাম।

ইমদাদুল হক মিলন : কিনলেন কি, ওটা তো ছিল একটা গিফট। ওটা আপনাকে উপহার দিয়ে গেল এক প্রকাশক। এ ধরনের ঘটনা বাংলা সাহিত্যে কোনো লেখকের ক্ষেত্রে কখনো ঘটেনি।

হুমায়ূন আহমেদ : এটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা ছিল। কিন্তু ইন্টারেস্টিং ঘটনার এখানেই শেষ না। আট মাসের মাথায় আরো বেশি টাকা হয়ে গেল। আমি কিনে ফেললাম মাইক্রোবাস। আমার মাইক্রোবাসের তো তখন দরকার নেই। কেন কিনলাম? এটার কোনো লজিক্যাল কারণ থাকতে পারে? কোনো কারণ নেই, কিন্তু আমার গাড়ি রাখার জায়গা নেই। হলের ভেতরও তো জায়গা নেই। একটা ছোট গাড়ি, আবার একটা মাইক্রোবাস বাসার সামনে পড়ে থাকে। আমার দেখতে খুবই ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে মাইক্রোবাসের দরজা খুলে রাতে মাইক্রোবাসে চুপচাপ গিয়ে বসা। এর চেয়ে হাস্যকর কিছু হতে পারে? একজন লেখকের পক্ষেই এ রকম হাস্যকর জিনিস করা সম্ভব। একজন লেখকের চারটি গাড়ি। একটা পর্যায়ে আমার গাড়ি ছিল চারটি। চারটি গাড়ির দরকার নেই আমার। কিন্তু ড্রাইভার আমার একটি। একটি লোক যে চারটি গাড়ি কিনবে তাঁর চারটি ড্রাইভার থাকবে বা তিনটি ড্রাইভার থাকবে। চারটি গাড়ি নিয়ে আমি বসে আছি, আমার ড্রাইভার কিন্তু একজন। চারটি গাড়ি কেন কিনলাম? এগুলো করার সুযোগ করে দিয়েছে আমার বইগুলো। আমার নানা ধরনের পাগলামি পূরণ করতে পারছি কী জন্য? মানুষজন আমার বই পড়ছে বলে। এই যে আমি সেন্ট মার্টিনে একটি বাড়ি কিনে রেখেছি, কেন? নুহাশপল্লী বানিয়ে রেখেছি, কেন?

ইমদাদুল হক মিলন : তার মানে, আপনার মনে হয় আপনার মধ্যে পাগলামি আছে?

হুমায়ূন আহমেদ : আমার মধ্যে পাগলামি আছে।

ইমদাদুল হক মিলন : এটা কি আপনার বাবার মধ্যেও ছিল? আমি যত দূর জানি, আপনার বাবা, আপনি ‘আমার ছেলেবেলা’ বইয়ে লিখেছিলেন যে তিনি এক মাসের বেতন পেয়ে একটি ঘোড়া কিনে নিয়ে এসেছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদ : ঘোড়া কিনে এনেছিলেন, বেহালা কিনে এনেছিলেন।

ইমদাদুল হক মিলন : আপনার বাবার ঘোড়া কেনার সঙ্গে আপনার মাইক্রো কেনার কোনো যোগসূত্র আছে?

হুমায়ূন আহমেদ : ভালোই তো মিলিয়েছ। শুধু ঘোড়া না, বাবা তাঁর বেতনের টাকায় বেহালাও কিনেছিলেন। সেই সময় উনি বেতন পেতেন আশি টাকা। বেহালাটা কিনেছিলেন পঁচিশ টাকা দিয়ে। ওটা কেনা মানে ওই সময় বেতনের অনেকটাই চলে যাওয়া। খুবই দামি একটি বেহালা। এই বেহালাটা তিনি ওপরে উঠিয়ে রেখে দিলেন। আমাদের নাগালের বাইরে রেখে দিলেন। কী জন্য বেহালাটা কিনলেন? কোনো একসময় তিনি একজন ওস্তাদ পাবেন বেহালার, তখন তিনি শিখবেন। তাই আগে থেকে কিনে বসে আছেন। সেই ওস্তাদও পাওয়া গেল না। হয়তো বা পাওয়া গেল, শেখার পয়সাটা জোগাড় করতে পারলেন না। তাঁর বেহালা শেখা হলো না। একটা পর্যায়ে বেহালাটা তাকের ওপর থেকে নামিয়ে আমরা ভাইবোনরা কিছুক্ষণ পোঁ পোঁ করে বাজাতাম, তারপর উঠিয়ে রাখতাম, বাবা যাতে টের না পান।

ইমদাদুল হক মিলন : আপনার লেখালেখির মধ্যে পাঠকরা একধরনের পাগলামির প্রকাশ দেখতে পায়, এর কারণটা কী?

হুমায়ূন আহমেদ : মিলন, তুমি এখন আমাকে দিয়ে বলানোর চেষ্টা করছ যে আমি পাগল। পাগল বলেই লেখায় পাগলামি উঠে আসে। আচ্ছা, যাও আমি পাগল। কি, তুমি খুশি তো? আর বকবক করবে না। স্টপ।

ইমদাদুল হক মিলন : আপনি বললে স্টপ।

(ইন্টারভিউ বন্ধ হলো। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর তোলা ফটোগ্রাফের স্তূপ নিয়ে বসলেন। একেকটা ছবি হাতে নিচ্ছেন এবং ব্যাখ্যা করছেন। আমি বললাম, আপনার ছবির চেয়ে ব্যাখ্যা সুন্দর। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, যাও, তোমাকে আর ছবি দেখাব না।)

ইমদাদুল হক মিলন : লেখাপড়ার প্রসঙ্গে আসি। আপনি একবার বলেছিলেন আপনি লেখাপড়ায় মনোযোগী ছিলেন না।

হুমায়ূন আহমেদ : না, ছিলাম না। ছোটবেলায় একেবারেই ছিলাম না। পড়াশোনায় আমার মন বসে অনেক পরে। স্কুলের সব পরীক্ষায় টেনেটুনে পাস করতাম। ক্লাস সিঙ্ ে(চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুল) ফেল করি। আমাদের ক্লাস টিচার বড়ুয়া স্যার আমার কান্নায় দ্রবীভূত হয়ে বিশেষ বিবেচনায় পাস করিয়ে দেন।

ইমদাদুল হক মিলন : পড়াশোনায় আপনার মন বসল কখন?

হুমায়ূন আহমেদ : তখন ক্লাস এইটে পড়ি। বৃত্তি পরীক্ষা হবে। ভালো ছাত্ররা বৃত্তি পরীক্ষার জন্য সিলেক্ট হয়েছে। তাদের বিশেষ যত্ন। ডাবল টিফিন পায়। যেহেতু বৃত্তি দিচ্ছে, তাদের ফাইনাল পরীক্ষাও দিতে হবে না। আমার খুব… [এখানে মজার একটা ঘটনা আছে, হুমায়ূন ভাইয়ের জবানিতে না, আমার মতো করে আমি ঘটনাটা লিখব]

ইমদাদুল হক মিলন : আপনার চাকরিজীবনের কথা বলুন। প্রথমেই কি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করলেন?

হুমায়ূন আহমেদ : না। প্রথমে জয়েন করলাম ময়মনসিংহের অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে মাস চার-পাঁচ মাস্টারি করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই।

ইমদাদুল হক মিলন : ময়মনসিংহের সময়টা আপনার কেমন কেটেছে?

হুমায়ূন আহমেদ : খুব খারাপ। যদিও ময়মনসিংহ আমার নিজের জেলা। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে একটি বাসা ভাড়া করে থাকতাম। মনে হতো নির্বাসনে এসেছি। সহকর্মীদের কারো সঙ্গই পছন্দ হতো না। তাঁদের চিন্তাভাবনা স্থূল মনে হতো। তাঁদের দেখে মনে হতো তাঁদের জীবন ক্লাস নেওয়া এবং ক্লাস থেকে ফিরে দুপুরে খেয়ে ঘুমানোর মধ্যেই আটকে গেছে।

ইমদাদুল হক মিলন : আপনার সময় কাটত কিভাবে?

হুমায়ূন আহমেদ : ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করে। রাতে লিখতাম। ‘অচিনপুর’ নামের উপন্যাসটি ময়মনসিংহে লেখা শুরু করি।

ইমদাদুল হক মিলন : তার আগেই তো আপনার ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ প্রকাশিত হয়ে গেছে।

হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ।

ইমদাদুল হক মিলন : আচ্ছা, এই যে ‘নন্দিত নরকে’ লেখা হলো একেবারে হঠাৎ করে। তার আগে ‘নন্দিত নরকে’তে একটা ভূমিকা ছিল, সোমেন চন্দরের একটা গল্প ‘ইঁদুর’ আপনাকে প্রভাবিত করেছিল_কিন্তু কথা সেটা না, কথা হলো ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বই পড়ার অভ্যাসটা আপনার কিভাবে হলো?

হুমায়ূন আহমেদ : ভূমিকাটা ছিল ‘শঙ্খনীল কারাগারে’। আর বই পড়ার অভ্যাসের কথা বলছ? এই অভ্যাস পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। তাঁর খুব পড়ার শখ ছিল। বাড়ি ভর্তি ছিল বইয়ে। তিনি লেখালেখিও করতেন। তাঁর একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। নাম ‘দীপ নেভা যার ঘরে’। তাঁর লেখা কলকাতার কিছু পত্রিকা, এ দেশের ‘দৈনিক আজাদ’-এ ছাপা হতো। লেখালেখি করে কলকাতার কোনো এক প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ‘সাহিত্য সুধাকর’ উপাধিও পেয়েছেন। সেই সময়ের লেখকরা নানা উপাধি পেতেন।

ইমদাদুল হক মিলন : আপনার ‘নন্দিত নরকে’ লেখা কি একেবারেই আচমকা? এর আগে আপনি কি কিছু লিখেছেন কখনো?

হুমায়ূন আহমেদ : কবিতা লিখেছি। ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। তবে নিজের নামে লিখিনি। কবিতাগুলো আমার ছোট বোন মমতাজ আহমেদ শিখুর নামে পাঠাতাম। তার নামেই ছাপা হতো।

ইমদাদুল হক মিলন : ছোট বোনের নামে পাঠাতেন কেন? নিজের নামে নয় কেন?

হুমায়ূন আহমেদ : কবিতাগুলো তেমন সুবিধার ছিল না। পুরুষ কবির কবিতা হিসেবে চলে না। মহিলা কবির কবিতা হিসেবে চলতে পারে।

ইমদাদুল হক মিলন : মহিলাদের সৃষ্টিশীলতাকে আপনি কি ছোট করে দেখছেন না?

হুমায়ূন আহমেদ : মিলন, তুমি বাংলা ভাষার দশজন মহিলা কবির নাম বলো, যাঁরা পুরুষদের পাশে দাঁড়াতে পারেন।

ইমদাদুল হক মিলন : আপনার ছোট বোনের নামে প্রথম যে কবিতাটি ছাপা হয় তার নাম কী?

হুমায়ূন আহমেদ : দিতে পার একশ ফানুস এনে/আজন্ম সলজ্জ সাধ, একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই।

ইমদাদুল হক মিলন : এটা তো মুক্তিযুদ্ধের আগে?

হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধের আগে।

ইমদাদুল হক মিলন : তার পরে এভাবে ক’টা কবিতা পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিল, আপনার মনে আছে?

হুমায়ূন আহমেদ : পাঁচটি কবিতা।

ইমদাদুল হক মিলন : তারপর আপনি উপন্যাস লিখলেন?

হুমায়ূন আহমেদ : নাহ্, উপন্যাসটা অনেক পরে…।

ইমদাদুল হক মিলন : উপন্যাসে আসার ঘটনাগুলো বলেন_এই ধরেন_কিভাবে শুরু, কিভাবে আইডিয়াটা এল মাথায়…

হুমায়ূন আহমেদ : প্রথমে তো আমি লিখলাম ‘শঙ্খনীল কারাগার’। যদিও প্রথমে এটা ছাপা হয়নি, কিন্তু উপন্যাস প্রথমে লেখা হয়েছিল ‘শৃঙ্খনীল কারাগার’। কিছুই করার ছিল না সেই সময়। আমার ঠিকমতো মনেও নেই। তবে এই উপন্যাসটা আমার বাবা পড়েছেন_এটা আমার জন্য খুবই আনন্দের একটা ঘটনা।

১,৩৯৩ বার পড়া হয়েছে

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ৫৪ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ৮০ টি
নিবন্ধন করেছেন: ২০১৩-০৭-০২ ১১:৫৫:৩৪ মিনিটে
banner

৬ টি মন্তব্য

  1. আমির হোসেন মন্তব্যে বলেছেন:

    সাাৎকার পড়লে একজন লেখক সর্ম্পকে অনেক কিছু জানা যায়।

  2. এ টি এম মোস্তফা কামাল মন্তব্যে বলেছেন:

    এ সাক্ষাৎকারটি,যতদূর মনে পড়ে, দৈনিক কালের কন্ঠের সাহিত্য পাতা শিলালিপিতে পড়েছি। শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

  3. শাহ্‌ আলম শেখ শান্ত মন্তব্যে বলেছেন:

    ভাল লাগল ।

  4. এই মেঘ এই রোদ্দুর মন্তব্যে বলেছেন:

    কবির সাক্ষাৎকার অনেক ভাল লাগল

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে লগিন করুন.

go_top