হারানো সুর
রাত্রি নিস্তব্দ,দিগন্ত বিস্তৃত চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠেছে চারদিকের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি। মায়াপুরির এই স্বপ্ন মাখা রাতে অতীতের কতইনা স্মৃতি ভেসে ওঠেছে আজ লাবণ্যর মনে। বাতাসের মৃদু মন্দ দোলায় আলতো ভাবে ঝরে পড়া শিউলি ফুলের মত কত আশাই না ঝরে গেছে ওর হৃদয় থেকে। হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো যেন লাবণ্যকে পিছু আজো ডাকে। আলো আঁধারের অঘোর মুহুর্তে সুবর্ণর মুখটা তার মনে ভেসে ওঠে। লাবণ্য তখন অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠে,‘আমরা আজ একই আকাশের নিচে তবুও তোমার আর আমার মাঝে কতইনা দুরত্ব। আমরা একই বায়ুমন্ডল থেকে শ্বাস নিই তবুও দেখা হয়না,কথা হয়না দুজনার। কি অদ্ভুত ব্যাপার তাই না সুবর্ণ?’
(দুই)
অথচ জীবনের কোন এক রঙ্গিন মুহুর্তে প্রেম যেন ওদের দুজনকে ছুঁতে চেয়েছিলো।গভীর থেকে গভীরে যেতে যেতে দুজন দুজনারে খুব ভালোবেসেছিলো।স্বপ্ন দেখেছিলো দুজন ওই দূর নীল আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে বেড়াবে। গভীর আত্মবিশ্বাসে একদিন সুবর্ণ লাবণ্যর হাত ধরে বলে ‘আমার হৃদয়ের মহিরুটি আজ বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে, আমার মন বাগানে আজ অসংখ্য লাল গোলাপের ছড়াছড়ি। প্রিয়া,জীবনে অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত তোমায় আমি ভালোবেসে যাবো। আমার ভালোবাসা সকল গতানুগতিকের উর্ধ্বে।’ প্রতুত্তরে লাবণ্য বলে, এই পৃথিবীর চন্দ, সূর্য, গাছ, আকাশ-বাতাস স্বাক্ষী রেখে আমিও বলছি তোমায় মরণের আগেও পরে ভালোবেসে যাবো। এভাবে লাবণ্যর শুন্য হৃদয়ের আঙ্গিনায় সুবর্ণ ইট পাথর বিনা গড়ে দিলো প্রেমের ভিত্তি। পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন তাদের হাতের মুঠোয়।
(তিন)
হঠাৎ লাবণ্যর জীবনে কাল বৈশাখী হানা দিলো। লাবণ্যও মন বাগানের সব ফুল ছিঁড়ে ফেললো সুবর্ণ। কিন্তু কেন এমন হলো তা লাবণ্য আজও জানেনা। ‘অথচ সুবর্ণ তুমি কি জানো? আজও প্রতিটি ঈদ, জন্মদিন, ভালোবাসা দিবস, সকাল-সন্ধ্যা বসে থাকি তোমার প্রতিক্ষায়। জানো বিধাতার ওপর আমার খুব রাগ হয়। তোমার আমার পথ যদি এত ছোট হবে, কেন তবে দুজন একই ছাদের নিচে পাঁচ বছর পড়ালেখা করেছি? জানি অনেক প্রশ্নের মাঝে এই প্রশ্নের উত্তর তোমার জানা নেই। জানো সুবর্ণ মাঝে মাঝে যখন গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন তোমার মুখটা খুব বেশী মনে পড়ে। তখন মনে হয় সাগরের সবটুকু জল যেন আমার দু’চোখে। আমার এই ছোট্ট পৃথিবীতে প্রতিমুহুর্তে ধ্বনিত হয় তোমার শুণ্যতা। যে দিকে তাকাই শুধু তোমার নিপুন হাতের গড়া স্মৃতিগুলো চোখে পড়ে। কিন্তু জানি আমার কোন মুক্তি নেই। আছে শুধু স্মৃতি ঘেরা সোনালী অতীত। তবে সুবর্ণ আমার মনে আজ দুঃখ থাকলেও আক্ষেপ নেই,বেদনা থাকলেও ব্যর্থতার গ্লানি নেই। আসলে বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে আমি তোমার ভেতরের কুৎসিত মনটা দেখতে পাইনি, তাই বুঝি কষ্ট পেতে হয়েছিলো আমাকে। সুবর্ণ আমি ঘূর্ণাক্ষরেও টের পেলাম না জীবনের রঙ্গমঞ্চে তুমি যে অসাধারণ অভিনয় করে গেলে। দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা স্বপ্নগুলি ভেঙ্গে দিলে তুমি। তবুও কেন জানি মিথ্যের মরিচিকার পিছনে ছুটছি আমি জানিনা। জীবন সংগ্রামে আজ আমি একা,পরাজিত,নিঃস্ব এক মানবী। এখনো আমি খুঁজি ফিরি হারানো সেই দিন গুলি। তোমাকে হারানোর সেই সুর আজো আমার কানে বাজে। অতীত নিরবে নিভৃতে সবার চোখে আড়াল হয়ে যায়। জানি তোমার মনেও আমার স্মৃতিগুলো উল্টানো ক্যালেন্ডারের মত অযত্মে পড়ে আছে,আর থাকবেও।’