Today 19 Jun 2026
Top today
Welcome to cholontika

মেঘের কোলে রোদ-২(ধারাবাহিক উপন্যাস)

: | : ০৯/০৯/২০১৩

সকাল থেকে বাম চোখটা কিরকির করছে। লক্ষণ ভাল না।হারাধন

জ্যোতিষী বলেছিল,উনপঞ্চাশ বছর বয়সটা একটু সামলে সুমলে চলো

শিবু, কোষ্ঠী অনুযায়ী ওই বছরটায় তোমার জীবনে অনেক ঘটনা ঘটবে।

— মরেটরে যাব নাকি ঠাকুর?

—বালাইষাট মরবে কেন,জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে, তিন বিধাতা নিয়ে, এ বিষয়ে কোন

ভবিষ্যৎবানী খাটে না।তবে আমার বিচারে সংকটগুলো মৃত্যু-সংক্রান্ত নয়, ওই

বয়সে তোমার এমন কিছু পরিবর্তন হবে, যা দেখে তোমার মনে হবে,এই শিবু কি সেই শিবু?

বাবার লেখা ডাইরীতে উল্লেখ আছে আশ্বিনের তের তারিখে শিবনাথ মন্ডল ওরফে শিবুর জন্ম। আজ সেই দিন। বাড়ির কেউ জানে না। কৃপণ হিসেবে খ্যাত শিবু মন্ডল আজ উনপঞ্চাশ বছর বয়সে পা দিয়েছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে শিবনাথ অবাক হয়েছে। অন্যদিন হলে সে বলতো,আমি কি সাহেব হয়ে গেছি যে, খালিপেটে বেড-টি খাব!

সদ্য-স্নাত অতসীকে দেখে মন কেমন ভাল হয়ে গেল শিবুর। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বলল, এত সকালে চা কেন মা?

—আজ আমার খুব আনন্দের দিন বাবা। স্বপ্ন দেখলাম আমার এক বন্ধু আসছে। খুব ভাল স্বপ্ন।রোজ তো গুড়-জল খাও,আজ না হয় আমার খুশিতে একটু চা খেলে।

— বন্ধুটি কি কলেজের?

— হোস্টেলে আমার  রুমমেট ছিল। খুব ভাল মেয়ে। বহুদিন দেখা নাই।

— স্বপ্ন তো সবসময় সত্যি হয় না মা। এই আমার কথায় ধর না, তোর জন্যে কতদিন ধরে ভাল পাত্রের সন্ধান করছি, একটাও পেলাম কি, পেলাম না।যারা আসছে তারা সব কসাই।এদিকে অল্প বয়সে তোর বিয়ে দেব বলে,এম-এ টাও পড়তে দিলাম না। আজ আপশোষ হচ্ছে।

বলতে বলতে সত্যিই হতাশ হলো শিবু। সকালবেলা অনেক গুলো মিথ্যে কথা বলে ফেলেছে সে। প্রথম মিথ্যে,মেয়েকে সে এম-এ পড়তে পাঠায়নি পয়সা খরচের ভয়ে,খরচা করে পড়ানোর পরে মেয়ের জন্যে আরো দামী পাত্র খুঁজতে

হবে।দ্বিতীয় মিথ্যে, অতসীর বিয়ের যে সব সমন্ধ এসেছিল, তার অধিকাংশ বাতিল

হয়েছে শিবুর নিজের ইচ্ছায়, বেশী খরচ করে মেয়ের বিয়ে দিতে একদম নারাজ

সে।

—তাতে কি হয়েছে বাবা, তুমি যা ভাল বুঝেছো, করেছো। আমি আমার স্কুল নিয়ে বেশ আছি।

—এই তো আমার লক্ষী-মা, তোর স্কুলটা এবার চালাঘর করে দেব। গাছতলায় ছেলে পড়াস আমার খুব খারাপ লাগে।

বলতে-বলতে বেশ মুষড়ে পড়ল শিবু। অতসীর স্কুল নিয়ে যথেষ্ট বিরক্ত সে।

ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কোন মানে হয় না। গরীব-গুর্বোদের ছেলেরা লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাচ্ছে বলে দেশে রাখাল-বাগালের আকাল পড়ে গেছে।এতদিন এমনই বলে এসেছে শিবু। আজ নিজের মুখে উল্টো সুর শুনে সে হতচকিত।বিমর্ষ।হারা-গুনীনের কথা কি ফলতে শুরু করল নাকি?

—আমার স্কুলের চালা পরে হলেও হবে, তুমি একটু খাসির মাংস আনো তো বাবা।

— তোর কি সত্যিই বিশ্বাস, তোর বন্ধু আসবে?

টাকা-পয়সা খরচের আশঙ্কায় পুরোন শিবু জেগে উঠছে মনের ভেতর।

— নাই-বা এল, আমরা খাব। কতদিন মাংস খাইনি বলো তো।

—ঠিক কতদিন বল তো?

—গত বছর কালীপুজোয়, মন্দির থেকে এসেছিল।

—ঠিকই বলেছিস, আসলে আমি সাংঘাতিক রকমের কেপ্পন হয়ে গেছি বুঝলি, তবে আজ আমি কেপ্পন খেতাবটা ত্যাগ করতে চললাম। এক্ষুনি বাজারে যাব, দু-কেজি মাংস কিনব, ভাল মাছ পেলে নেব।মিষ্টিও আনবো।শুধুমাত্র তোর খাতিরে।

অতসী হাসিমুখে বলল, যা তোমার খুশি।তবে যাবার আগে একটু মিষ্টিমুখ করে যাও। মা পায়েস তৈরী করেছে। আমি নিয়ে আসছি।

হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হলো শিবু। পকেট-ভর্তি টাকা।বুক-ভর্তি বাতাস।

টাকাগুলো আজ অন্যদের পকেটে ঢুকে যাবে,ভাবতে খারাপ লাগছে না।শিবুর

নাম হয়তো এবার কৃপণদের তালিকা থেকে বাদ পড়বে,পড়ুক।

সদর দরজায় পা দিয়ে হোঁচট খেল শিবু।

পাঁচ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যেতে হবে বাজারে,প্রথমেই বাধা।

জিনসের প্যান্ট আর টাইট গেঞ্জী পরা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে।বলছে, কাকাবাবু ভাল আছেন?

নিজের ছেলেকে গোবর-গনেশ মনে করে শিবু। এই মেয়েটা তার খোঁজে আসেনি তো? মুখ কুঁচকে বলল,হ্যাঁ, কিন্তু তোমাকে তো চিনলাম না?

—আমি রোমিলা, অতসীর বন্ধু।

— ওহ, অতসীর বন্ধু, তাই বলো, আমি ভেবেছিলাম আমার ছেলের,যাকগে সে-কথা,তুমি বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাও মা। আমি তোমার জন্যে মাংস আনতে যাচ্ছি।

—আমার জন্যে মাংস!

— হ্যাঁ, তোমার জন্যে, অতসী আজ ভোরে স্বপ্ন দেখেছে তুমি আসবে, তাই আমাকে বাজারে পাঠালো, যাও মা, যাও, ভেতরে যাও।

রোমিলাকে অবাক করে দিয়ে সাইকেলে চড়ে বসল শিবু।

 

 

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ০ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১ টি
নিবন্ধন করেছেন: মিনিটে

মন্তব্য করুন

go_top