Today 19 Jun 2026
Top today
Welcome to cholontika

ধারাবাহিক উপন্যাস “নিয়োগ পত্র” চতুর্থ পর্ব

: | : ০৯/০৯/২০১৩

(চতুর্থ পর্ব)
(পাঁচ)
গ্রীষ্ম কাল।
সন্ধ্যা হতেই দ্রুত রাত বাড়তে থাকে। ভ্যাপসা গরম। মাথার উপর টিনের চাল। বৈদ্যুতিক পাখা নেয়। তিমির কতদিন ভেবেছে এমাসে একটা ফ্যান কিনবে। আর হয়ে উঠেনি। রাতের কোলাহলটাও সহজে থামে না। অনন্তর ভালোই লাগে। রান্নাও শেষ। তাল পাতার হাত পাখাটা নিয়ে দরজায় এসে বসেছে। হালকা বাতাস লাগছে গায়ে। তিমিরটা যতক্ষন না ফিওে ততক্ষন বসে অপেক্ষা করতে ভালো লাগে। একা খেতেও ইচ্ছা করে না। সদ্য রান্না করা ইলিশ মাছের তরকারীর গন্ধটা বেশ লাগছে নাকে। একটা বিড়ি জ্বালিয়ে হাত পাখাটা আস্তে আস্তে ঘুরাতে থাকে। প্রচুর অবসর অনন্ত দার। কত কিছু ভাবে। নিজেকে নিয়ে। নিজের মনে বলে এই অনন্ত পাগলার জীবটা বুঝি এভাবেই যাবে।
সারা গাঁয়ে অনন্ত বাবুদের দাপট চিল এক সময়। অনন্তর বাবা সুবিমল রায়। যতদিন বেঁচেছিলেন জমিদারী হাল চালে বেঁচেছিলেন। যৌথ পরিবার। পারিবারিক বংশমর্যদা ক্ষুন্ন হতে দেননি কখনও। সুবিমল রায়-এর চার ছেলের মধ্যে অনন্ত সবার ছোট। সবাই আদর করে ডাকত অনু।
রায় বাবুর মৃত্যও সময় অনুর বয়স পনের কি ষোল। কিশোর বয়স। বিষয় আশয় নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যাথা ছিল না। বড় ভাই বাবার মত। বাবার মৃত্যর পর অনুর আদর যতœও বেড়ে গেল। কোথাও কোন ত্রুটি হতে দেয়নি। বিশেষ করে বড় দাদা। বড় দা অমৃত রায়। আর সেজ দা সুশান্ত রায়। দু’জনেই  বিবাহিত। মেঝ দা প্রশান্ত রায়। বিয়ে শাদী তখনও করেনি। লেখাপড়া শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করছিল। তাতে বড় দার খবরদারি ছিল অনেক বেশী। নিত্য দিনের আয় ব্যয়, লাভ লোকসান কড়ায় গন্ডায় হিসাব নিত। অনুর কখনও এ সমস্ত বৈষয়িক ভাবনা ভাবতে হয়নি। কিংবা ভাবতে দেয়নি। বরং কিসে অনুর ভালে হবে তাই নিয়ে যেন বেশী অস্থির হয়ে পরতো অমৃত রায়। অনুর বড় দাদার উপর সব বিশ্বাস ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল।

লেখাপড়া বেশীদূর এগোয়নি। মেট্রিক শেষ করে কোথায় যেন ভালো কলেজে ভর্তি করাবে। আর অমনি বেশ কিছু কাগজে সই নিলো বড় দা। তাতে রাতা রাতি দৃশ্যপট পাল্টে গেলো। অনন্ত মস্ত বড় ভূল করেছে। আজ প্রায় সর্ব হারা। নিজের বলতে কিছুই নেয়। শুধু মাত্র ভিটের অংশটা ছাড়া। তাও অনেকটা দয়া করেছে বড় দা। বলেছে, বিয়ে থা করে কোথায় যাবি। লোকে খারাপ বলবে। বলবে- রায় বাড়ীর ছোট ছেলে সব সম্পত্তি বিক্রি করে আজ পথে বসেছে। আমার মুখেও চুনকালি পরবে। বড় ভাই বলে কথা। হাজার হোক ভালো মন্দ তো আমাকেই দেখতে হবে।
বাবার মৃত্যও পর বেশ কিছু কাঁচা পয়সাও হাতে এসেছিল। তাতেও ঠকতে হয়েছে। পরে মনে হয়েছে চার ভাগের এক ভাগে যা পড়ে তাতে যা পেয়েছে তার তুলনায় অনেক বেশী। তবে কোন প্রতিবাদ করেনি।  প্রতিবাদ করে কি হবে। টাকা পয়সার তেমন প্রয়োজন ছিল না। খাওয়া দাওয়া ভরন পোষন সবিই তো বড়দার ভাগে চলে যাচ্ছে। সামান্য ক’টা টাকা। তাও আবার ভাগাভাগি। তাছাড়া ওদের ছেলে মেয়ে আছে। সংসার আছে। খরচা পাতিও বেশী। ওদের ভাগে একটু বেশী থাকলেই বা ক্ষতি কি।
অমৃত রায় ভাগ করে দেওয়ার সময় বলেছিল-তোর তো খরচ নেয়। এই নে তোর ভাগের দশ হাজার। ওখান থেকে বাবার শ্রাদ্ধ ক্রিয়ার জন্য পাঁচ হাজার দিবি। সবাই পাঁচ করে দিচ্ছি। মোট বিশ হাজার। ক্রিয়ার জন্য বাবাও কিছু রেখে গিয়েছে। মার হাতে কিছু আছে। কোন ভাবে হয়ে যাবে। তার উপর এই ক’দিন অতিথি সজ্জন আসবে। বাড়তি কিছু খরচা পাতি তো লাগবেই। বাকীটা আমি আর সুশান্ত সামলে নেব। তোর ভাবতে হবে না।
অনন্ত গলায় উত্তরীয় নিয়ে বলেছিল-মার হাতের টাকাটা নেওয়ার দরকার নেয়। আমার ভাগের পুরো টাকাটায় বাবার শ্রাদ্ধে খরচ কর। আমার দরকার হবে না। তাছাড়া আমার তো তেমন খরচ নেয়।
অনন্ত-র অতীত আর বর্তমান। সে শুধু নিজেই ভাবে। যেদিন বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল বড়দা সমস্ত হিসাব নিকাশ সব কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছিল। এমন কি আনুপাতিক হিসাবে এ ক’বছরের খাওয়া খরচটা সহ। অনন্ত একবারও জিজ্ঞাসা করেনি। জানতেও চায়নি। তবু দায়মুক্তির কথা ভেবে বড় দা সব হিসার গড় গড় করে বলে দিল। পরে এ নিয়ে যেন কোন ঝামেলা না হয়। কেউ যেন জিজ্ঞাসা না করে ছোট ভাইয়ের সম্পত্তি বড় ভাই বেহাত করে নিয়েছে।
আজকের অনন্ত শুধু সেসব ভাবে। চোখের কোনায় জল জমে। লুঙ্গির কাঁচায় জল মুছে। পাশের রুমের হাশেম ঘরে ঢুকতেই জিজ্ঞাসা করে-
–    কি ব্যাপার অনন্ত দা। অপেক্ষা কিসের।
–    ওই পাগলটা এখনও আসেনি। দেখেছো কোথাও।
–    না। তুমি এত অস্থির হচ্ছো কেন। তিমিরদা তো ছোট খোকা নয় যে হারিয়ে যাবে।
অনন্ত চুপ করে থাকে। কোন উত্তর দিতে পারে না। হাশেম ঘরের ভিতর হাতের কাগজটা রেখে আবার বেরিয়ে আসে। অনন্তদার পাশে বসে বলে-
–    তুমি তিমিরদাকে এত ভালোবাস। আমার মনে হয় কোন বাবাও তার ছেলেকে এতটা ভালোবাসে কিনা জানিনা।
–    কি জানি। আমি কেন ওই পাগলটাকে অতটা ভালোবাসতে যাবো। ও আমার কে। তবে আমার ইচ্ছা হয় বাকী জীবনটা ওর পাশে থেকেই কাটিয়ে দিই।
অনন্তর মনে বড় কষ্ট। একটা দীর্ঘশ্বাস তা জানান দিয়ে গেল।
–    তুমি পারবে অনন্ত দা।
–    ক’টা বাজে বলতে পারো।
–    এগারটা।
হাশেম রুমে ফিরে যায়। অনন্ত একবার উঠে ঘরের ভিতর আলোটা নিভিয়ে দিয়ে আবার দরজায় এসে বসে থাকে। আর শুধু নিজের মনে ভিড় ভিড় করে কি যেন বলতে থাকে। তিমিরের বন্ধু মফিজ এসে জিজ্ঞাসা করল-
–    তিমির এখনও ফেরেনি।
–    লুকিয়ে তো রাখিনি। ভিতরে গিয়ে দেখো। আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছি।
হন হন করে উঠে আলো জ্বালল অনন্ত। মফিজ বুঝতে পেরেছে অনন্তদার মনটা ভালো নেই। এই কলোনীতে সবাই অনন্ত দাকে ভালোবাসে। তিমিরের বন্ধু বান্ধবরাও জানে অনন্তদার স্বভাব। মফিজ জিজ্ঞাসা করে-
–    দেরী হচ্ছে দেখে মন খারাপ করেছো, তাই না।
–    আমার কি দায় পরেছে। আমি কালই চলে যাবো। আর একদিনও থাকবো না।
মন খারাপ থাকলে এরকম কতক্ষন পর পর বলবে এখনিই যাবো, এক মূহুর্তও থাকবো না। সবশেষে আর যাওয়া হয়ে উঠে না। মফিজ হাসে।
–    আচ্ছা বাবা তা না হয় গেলে। এখন কোথায় গেছে বলতে পারো। বিকালে আমার বাসায় যাওয়ার কথা।
–    কিছু বলেনি। শুধু বলল-কাজ আছে। ফিরতে রাত হবে। তুমি খেয়ে নিও। শালার আমি যেন সর্বভূখ। শুধু খাওয়ার জন্য এখানে পরে আছি।
–    অনন্ত দা। তুমি চলে গেলে তিমিরকে কে দেখবে। তুমি জান না ও তোমাকে কত ভালোবাসে। আমি চলি। আসলে বলো, আমার সাথে যেন কাল অবশ্যই দেখা করে। জরুরী দরকার আছে।
–    আচ্ছা।
মফিজ চলে যায়। অনন্ত মনে মনে ভাবে তোমাদের দরকার বুঝি আর কোন কালেই শেষ হবার নয়। প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। ইচ্ছা করলে বাজারের টাকা থেকে দ’ুটাকার কলা মুড়ি কিনে খেতে পারে। তাও খাবে না। রাত সাড়ে এগারোটা। ছেলেটা এখনো আসছে না। রাত বিরাতে কত রকম আপদ বিপদ। তার উপর ক্ষুধার যন্ত্রনা। দু’গ্লাস পানি খেয়েছে। আজ ইলিশ মাছ রান্না হয়েছে। তিমিরকে ছাড়া কিছুতেই খেতে ইচ্ছে করছে না। না খেয়ে বসে থাকলেও তিমিরের বকা শুনতে হয়। এসে বলবে-তোমাকে কে বলেছে এত রাত পর্যন্ত না খেয়ে বসে থাকতে।
কেন বসে থাকে সেটা অনন্ত বুঝাবে কি করে। চুপ করে থাকে। তিমিরও যে বুঝে না, তা নয়। সবই বুঝে। মনের ব্যাপার গুলো আপেক্ষিক। সত্যিকার অর্থে প্রকাশের ভাষা থাকে না। নিতান্ত অন্তরের ব্যাপার। দু’জনেই বুঝতে পারে। কথা বার্তা, ঝগড়া ঝাটি যা হয় তা শুধু মনের ঝাল মেটানোর জন্য। রাগ, ক্ষোভ দমন করার জন্য। অনন্ত রাগ করে উঠে গিয়ে আবার অলোটা নিভিয়ে দিয়েছে। কলোনীর সবাই ফিরেছে। এখন যে যার মত রান্না বান্না নিয়ে ব্যস্ত। একমাত্র তিমির এখনও ফেরেনি। তিমিরের রান্নার চিন্তাও নেয়। অনন্ত আছে। খাওয়া দাওয়ার পর আবার শুরু হবে কোলাহল। ঘন্টা দুয়েক চলবে। টিনের চালাটা ঠান্ডা হওয়ার পর কোলাহল থামেবে। তারপর সকলের বিশ্রাম।
রাত বারোটা। অনন্তর চোখ দুটো ঘুমে ঢলে পরছে।
পাশের বাসার দরজায় হাশেম, মনির, দুলাল, রতন খালি গায়ে বসে গল্প করছে। দরজাটা খোলা। ভিতরের অলো নেভানো। অনন্ত ঘুমিয়েছে। নাক ডাকার অভ্যাস আছে। ঘুমটা এখনও গাঢ় হয়নি। তাই নাক ডাকার শব্দটা হালকা। তিমির ডাকল-অনন্ত দা। অনন্ত দার সাড়া নেয়। চুপ চাপ শুয়ে আছে। তিমির লাইট জ্বালায়। আবার ডাকল তিমির। কোন সাড়া নেয়। নিজের মনে বিড় বিড় করে বলল-আমি কালই যাব। অনন্ত চোখ না খুলে বলল-ও এসেছো। অনন্তর স্বরটা বড় অভিমানী। না পারে সইতে, না পারে কইতে।
চোখ খুলে তিমিরকে দেখে আৎকে উঠে। এ কি? মুখটা ফ্যাকাশে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। মুহুর্তেই অনন্তর সমস্ত রাগ অভিমান পানি হয়ে গেলো। তিমিরের মনের কষ্টটা উপলব্দি করতে পারে। এমনটি প্রায়ই হয়। গলা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করে-এত রাত হলো। নিশ্চয় পেটে কিছু দাওনি। মুখটা শুকিয়ে গেছে। আগে হাত মুখ ধুয়ে আস। আমি ভাত বাড়ছি। কোথায় গিয়েছিলে।
তিমিরের মেজাজ ঠিক নেয়। অনন্তর নরম কথায়ও মাথা গরম হয়ে উঠে। হাতের ফাইলটা খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলে বলল-
–    কোথায় আবার। আমার শ্রাদ্ধ করতে। শালার সমাজ পতি। মুখে থুথু দিতে ইচ্ছা করে। কি পেয়েছে। আমরা বেকার বলে কি মানুষ নই। আজ গেলে বলে কাল এসো। কাল গেলে বলে পরশু। তাও ভিক্ষুকের মত বাইরে বসে থাকা। আমরা যেন কুকুর বেড়ালের মত। দু’তিন ঘন্টা বসে থাকার পর বলবে, আমি তো আলাপ করতে ভুলে গিয়েছি, কাল পরশুর দিকে একবার এসো। কেমন লাগে। আমাদের সময়ের যেন কোন মূল্য নেয়। শালার চৌধুরী। মিঠা বেপারীর ছেলে আজ শিল্পপতি হয়েছে। সমাজপতি হয়েছে।
অনন্তদার মুখে রা শব্দটি নেয়। এই সময় মুখের উপর কিছু বলতে যাওয়া মানে সাক্ষাৎ জমের হাতে পরা। আর কথা বাড়ানো মানে খাওয়া দাওয়া বন্ধ। সারা রাতেও শেষ হবে না। একটার পর একটা সিগারেট পুড়বে। তিমির হাফিয়ে উঠেছে। এক গ্লাস জল চাইল। অনন্ত জল দিয়ে বলল – কোন ঝগড়া হয়েছে। বড় বাবুদের সাথে ঝগড়া করে তো কোন লাভ নেয়।
জলটা শেষ করে বলল – ঝগড়া করতে যাবো কোন আক্কেলে। আমাদের গ্রামের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সমাজপতি চৌধুরী বাবু। একটা চাকরীর কথা বলেছিলাম। ইচ্ছা করলে এক টেলিফোনেই শত জনের চাকরী দিতে পারে। সেই থেকে অফিসে যাওয়া আসা। আজ নয় কাল। ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করা।
–    ওরা বড় লোক। ওদের অপেক্ষায় থাকলে তোমার গায়ের চামড়া ক্ষয়ে যাবে, তবুও চাকরী হবে না। তুমি না গেলেই পারতে। গ্রামের ক’টা মানুষের চাকরী দিয়েছে। শুধু নিজের স্বার্থটায় দেখে। বাদ দাও তো ওসব। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নাও। খাবার সব ঠান্ডা হয়ে গেলো।
–    বড় লোক তো কি হয়েছে। না হলে সোজা বলে দেবে, হবে না। আমিও গিয়েছিলাম একটা কাজের জন্য। উনি দান ধর্ম করেন। আমি তো ভিক্ষা চাইতে যায়নি। গ্রামের শিল্পপতি হিসাবে আমরা কি এটা প্রত্যাশা করতে পারি না।
–    আমাদের প্রত্যাশা করাটায় ভূল। আমরা ক্ষুধার্ত মুখে যা চাইব ওরা তা বিলাসিতায় উড়িয়ে দেবে। বাদ দাও ওসব। রাত অনেক হয়েছে। খাবে এসো।
–    খাবো না।
–    সে কি। খাবে না কেন। আমিও খায়নি।
–    তুমি খাওনি কেন।
–    ভাবলাম অনেকদিন পর ইলিশ মাছ রান্না হয়েছে। দু’জন একসাথে খাবো।
তিমির হাত মুখ ধুয়ে আসে। ষ্টোভের সামনেই একটু খানি জায়গা। ভাত তরকারীর হাড়িটা নিয়ে ওখানেই বসে দু’জন। ঠান্ডা খাবার। খেতে মন চাইছে না। রান্নাটাও মন্দ হয়নি। দু’এক লোকমা মুখে দিয়ে তিমির বলল রান্নাটা ভালো হয়েছে।
–    আর এক টুকরো পেটের মাছ দিই।
–    না।
–    আজ কি বলল।
–    কি আর বলবে। আগামী সপ্তাহে এসো। আমিও শুনিয়ে দিয়েছি। আপনার এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকার চেয়ে মুদী দোকানে মাল মাপা অনেক ভালো। আমার আর চাকরীর দরকার নেই। আসারও প্রয়োজন নেয়। বলেই সোজা বাইরে চলে এসেছি।
–    খুব হয়েছে। আরও কিছু শুনিয়ে দেওয়া দরকার ছিল।
–    দেবো। সময় আসুক। শুধু বলবো যে, আমরা বেকাররাও মানুষ। আপনাদের মত বড় লোকেরা আমাদেরকে শুধু বেকার হিসাবে নয়, মানুষ হিসাবে ভাবতে শিখুন।
তিমিরের চোখে মুখে বিদ্রোহের অভিব্যাক্তি। ভাতের থালায় জল ঢেলে দেয়। অনন্তরও খেতে ইচ্ছা করছে না। চুপ চাপ পাশে বসে আছে অনন্ত। বাম হাতে হাত পাখাটা আস্তে আস্তে ঘুরাচ্ছে। বাতাসটা দু’জনের গায়েই আলতো ভাবে লাগছে। মুখে জল দিয়ে গামছার কোনায় মুছে নেয়। তারপর সিগারেট জ্বালিয়ে লম্বা একটা টান দেয়। তারপর বলে-
–    বুঝলে অনন্ত দা। এ যন্ত্রনা নিয়ে আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। চার বছর হলো পাশ করেছি। এর মধ্যে কত চেষ্টায়তো করলাম। কিছুই হলো না। শুধু অভিজ্ঞতা নেই বলে। আর সরকারী ক্ষেত্রে চায় মামা চাচার তদ্বীর। চাকরীর বয়সটাও ফুরিয়ে আসছে। এদিকে অসুস্থ বাবা, সংসার। মাঝে মাঝে জীবনটাকে বড় অভিশপ্ত মনে হয়। বেঁচে থাকাটা যেন মৃত্যর চেয়েও কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক।
আজ আর বাইরে বসা হয়নি। মিনহাজ আর দুলাল এসে ধন্যবাদ জানিয়ে গেলো মিষ্টি খাওয়ানোর জন্য। দেওয়ালের সাথে বালিশে হেলান দিয়ে মাথাটা এলিয়ে দেয় তিমির। অনন্ত হাড়ি পাতিলগুলো গুছাতে গুছাতে বলে-
–    আমি লেখাপড়া করিনি বলে কষ্ট হয়। কিন্তু তোমাদের মত শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের বেকারত্বের কষ্ট দেখে ভাবতে হচ্ছে তোমরা কত অসহায়।
–    অনন্ত দা।
–    কি।
–    বাবার পেশা ছিলো চোঠখাটো মুদি দোকান। বাবা চায়নি আমরা ভাইয়েরা কেউ ঐ ব্যবসা আঁকড়ে ধরে থাকি। বলতো লেখাপড়া শিখলে আর কিছু না হোক সৎভাবে টিউশানি করে হলেও জীবন চলে যাবে। আসলে বাবা ঠিকই বলেছেন। এখনতো টিউশনি করেই চলছে।
–    থাক না ওসব। রাত অনেক হয়েছে। এবার শুয়ে পরো।
–    আজকাল টিউশনিও পাওয়া মুশকিল। সব স্কুল টিচারদের হাতে। উনাদের কাছে না পড়লে পাশ করা কঠিন। তা গার্জিয়ানরাও ভালো জানে।
অনন্ত এঁটো থালা বাসনগুলো গামলায় রেখে হাত মুখ ধুয়ে নেয়। তারপর তিমিরের পাশে বসে জিজ্ঞাসা করে-
–    তোমার পিঠে একটু সুড়সুড়ি দেবো।
–    না, তুমি ঘুমাও। আমি বাইরে কিছুক্ষন বসবো।
–    সবাই ঘুমিয়েছে। সারাদিন খাটা খাটুনি গেছে। এবার শুয়ে পড়।
–    আমার ঘুম আসছে না।
তিমির বাইরে এসে দাঁড়ায়। হাতের সিগারেটটা শেষ। আরেকটা সিগারেট জ্বালায়। সাড়া শহরটা নিসতব্দ। কেবল মাঝে মধ্যে দু’একটা রিক্সার টুং টাং শব্দ। আকাশের দিকে তাকায়। জোড়ে একটা নিশ্বাস নেয়। ভাবে পৃথিবীটা কত সুন্দর। কত রুপ, কত গন্ধ। সাগরের বুকে কত জল। এতসব উপভোগ করার সময় কোথায় একজন কর্মহীন মানুষের।
তিমির যখনই এসব কথা ভাবে একটা টিকটিকি ঠিক ঘরের কোণায় টিক্ টিক্ টিক্ টিক্ করে ডেকে উঠে। প্রায় প্রতিদিন। যেন বলছে তোমার সুসময় আসবে। আজ নয় কাল। ধৈর্য ধরো। আমি সত্যের ইঙ্গিত পৌঁছে দিচ্ছি।
কথার মাঝে টিকটিকি ডাকলে কিছুটা আস্বস্ত হয় সেকেলে সমাজ। বিশ্বাস করে এই বুঝি সত্য হলো। তিমির এসব বিশ্বাস করে না। তবুও নিজের অজান্তে টিকটিকি ডাকার সাথে সাথে জিহ্বাটা দাঁতে ঠিকিয়ে চুক চুক করে শব্দ তোলে। কিছুটা আসস্ত হয়। দুর্বল মুহুর্তে এটায় বড় সান্তনা।
মানব সমাজে খুব কম লোক আছে যারা সান্তনা দেয়। অন্যের কষ্টটা নিজের বলে উপলব্দি করতে পারে। উপহাস করার অনেকে আছে। নিজের মত করে দু’কথা শুনিয়ে দিতে পারলে যেন বাহাদুরিটা প্রকাশ পায়।  সমাজে একটা আসন ওদের জন্য বরাদ্ধ থাকে। যারা নিজেদের আড়ালে একটা ছদ্মবেশ লুকিয়ে রাখতে পারে।
সেদিন পরেশ কাকা কেমন করে বলে বসল-বাপের হোটেলে খাচ্ছোতো বেশ। বলি এভাবে আর কতদিন চলবে। কিছু একটা করো। কিছু না পারো তো বাবার মুদির দোকান আবার শুর করতে পারো। দেশে কি কাজের আকাল পরেছে।
তিমির প্রতিবাদ করতে পারল না। বলতে পারল না আমি রোজগার করে খায়। টিউশনি করি। সেটাতো কাজ নয়। এসব কথাগুলোর প্রতিবাদ করার ভাষা থাকে না। শুধু যাকে উদ্দ্যেশ্য করে কথাটা বলা, সেই জানে তার কথাটা একজন বেকারের মনে কতটা আঘাত করতে পারে।
পরেশ বাবুরা যা পারে তা তিমির পারে না। পরেশ বাবু এক কাপ চায়ের বিনিময়ে নিজেদের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে পারে। পাঁচশ টাকার বিনিময়ে নিজের বিবেক বুদ্ধি বন্ধক রেখে মিথ্যা স্বাক্ষী দিতে পারে। একজন খুনীকে সাধু বানাতে পারে। নিজের বগলের নীচের গন্ধটা চাপা থাকে। অন্যের সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়। অমৃতে গরল মিশিয়ে সমাজের সহজ সরল মানুষদের বোকা বানিয়ে দু’পয়সা ভালোই কামাই। নন্দিত না হয়ে নিন্দিত হলেও তেমন ক্ষতি নেয়।
তিমিরের রাত জাগার অভ্যাস আছে। তেমন ক্লান্তি বোধ হয় না। এর মধ্যে অনন্তর ডাক পরে কয়েকবার। তিমির বলে দিল-তুমি ঘুমাও। আমি আসছি। অনন্ত অসহায়ের মত শুয়ে আছে। দু’হাত তুলে প্রার্থনা জানায় ভগবানের কাছে। হে ঈশ্বর, তুমি তিমিরের জীবনটা সুন্দর করে দাও। আর আমাকে এই মানুষটার পাশে থাকার সুযোগ দাও। আমি ওকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। আমি চলে গেলে ও বড় একা হয়ে যাবে।

নিঃসঙ্গ রাত গুলো তিমিরের খুব ভালো লাগে। একাকীত্বের খাপছাড়া স্বপ্নগুলো জীবনটাকে অনেকদূর নিয়ে যায়। সুন্দরের প্রত্যাশা নিয়ে স্বপ্ন দেখা হয়। রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি আসে ওরা। কাউকে কিছু না বলে আসে। আবার দিনের আলোয় হারিয়ে যায়। জন কোলাহলে একজন বেকার যুবকের ব্যস্ততার পদভারে সে স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়। বিষন্নতায় নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। মনের অজান্তে ঈশ্বরের চরণে ধিক্কার দেয়। ঈশ্বর যা বোঝেন তা তিমিরের বোঝার কথা নয়। তবুও ঘুমোবার আগে মন থেকে একবার ঈশ্বরের ডাক পরে।
চলবে……

লেখক সম্পর্কে জানুন |
সর্বমোট পোস্ট: ০ টি
সর্বমোট মন্তব্য: ১ টি
নিবন্ধন করেছেন: মিনিটে

মন্তব্য করুন

go_top