মেঘের কোলে রোদ-৩
সকাল থেকে ঝাঁটা হাতে বাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাবেয়া।মুখে বলছে, একবার বাড়ি ফিরুক সে হারামজাদা,
ওকে যদি ঝেঁটিয়ে বিদেয় না করি তবে আমি হাফেজ-সাহেবের বিটিই লয়।
সকালবেলা প্রতিবেশীরা এসেছে। বৃত্তান্ত শুনেছে। বলেছে, অমন অলক্ষুনে ছেলেকে বিদেয় করা
সমুচিত কাজ।
রাবেয়ার গলার ঝাঁজ তাতে আরো বেড়েছে, অলক্ষুণে বলে অলক্ষুণে জন্মের আগে বাপকে খেয়েছে।
জন্ম দিতে গিয়ে মা মলো। আমি যদি-বা মায়া করে নিয়ে এলাম, কোলেপিঠে করে মানুষ করব বলে,
আমার মানুষটা মরে গেল।আমি সব সহ্য করেছি, কিন্তু আর সহ্য করব না।
পড়শীরা সায় দিয়েছে, তা-তো বটেই, তা-তো বটেই, অমন ছেলের মুখ দেখাও পাপ, খালা কত
কষ্ট করে লেখাপড়া শেখাল।কোথায় চাকরী-বাকরীর চেষ্টা করবে তা নয়,কার অসুখ, কার বিসুখ
এই নিয়েই পড়ে আছে।
রাবেয়া তাতে আরো উৎসাহিত হয়। বলে, ওসব তো আমি কত সহ্য করি, আমার বাক্স খুলে টাকা
নিয়ে পালায়, সেই টাকায় লোককে হাসপাতালে ভর্তি করে, ওষুধ কিনে দেয়, আমি টের পায় না
ভেবেছো,সব টের পায় কিন্তু কিচ্ছু বলি না, হাজার হোক মা-মরা ছেলে, আমাকেই তো মা জানে!
কিন্তু আজ যা স্বপ্নে দেখলাম তা যদি সত্যি হয় তবে আমি ওকে তেজ্যপুত্তুর করবই করব। তা যদি
না করি তবে আমি হাফেজ সাহেবের বিটিই লয়!
পড়শীরা মহা উৎসাহে বলে, তা-তো বটেই, তা-তো বটেই, এমন অন্যায় সহ্য করা যায়, মানুষ
কত সহ্য করে, কেনই বা এত সহ্য করবে?
রাবেয়া তাতে খুব একটা কান দেয় না। বলে, কতদিন ধরে বলছি, এবার একটা বিয়ে কর বাপধন,
নতি-পোতার মুখ দেখে বুক জুড়ায়, শান্তিতে মরি। বাপধনের আমার গরজ। বলে কিনা, আমার মত
বেকারকে কে মেয়ে দেবে মা? হলিই-বা বেকার, ভিখারী তো আর নোস, আল্লার রহমতে আমার
এখনও কিছু জমিজমা আছে, সোনাদানা এককণাও ভাঙিনি, সে-সব কি কবরে নিয়ে যাব?
— তা-তো বটেই, তা-তো বটেই, সোনাদানা নিয়ে কে আর কবরে যায়, কখনও কি গেছে?
— যায় না মানে, আলবৎ যায়, মিশরের রাজারাণীরা মরার পরে কবরে সোনাদানা সহ গেছে।
— হুঁ, হুঁ, তা-ও ঠিক, আপনেও তাহলে তেমন কিছু করেন।
— হুম, তাই করব ভাবছি। তবে তার আগে হারামজাদাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করব। ভোরবেলা স্বপ্নে
দেখি কিনা, বাপধন আমার বাড়ি ফিরেছেন, সঙ্গে একটা ভিন্-জাতের মেয়ে!
পড়শীরা বৃত্তান্ত শুনে নানা রকম শলা-পরামর্শ দিয়ে নিজের নিজের বাড়ি ফিরে গেছে। তারা কান
খাড়া করে থাকছে, কখন রাবেয়ার আর্ত-চিৎকার শোনা যায়। যদি শোনা যায় তবে বুঝতে হবে
ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়।
বেলা গড়িয়ে যায় রাবেয়ার গলার স্বর খাদে নেমে আসে। শেষমেষ সে কাঁদতে শুরু করে, ও বাপধন
কোথা গেলি তুই, তাড়াতাড়ি ফিরে আয়, মাকে ছেড়ে সাত-সাতদিন বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে থাকতে
তোর কি মায়া হয় না।
কাঁদতে-কাঁদতে রাবেয়া একসময় শুনল, কি হলো মা, অমন করে কাঁদছো কেন, স্বপ্ন দেখলে বুঝি
আমি মরে গেছি?
বোনপোর কথায় সম্বিত ফিরল রাবেয়ার। প্রথমে সে চোখের জল মুছে হতচকিত হয়ে এদিক-সেদিক
তাকাল, দেখল, সে সত্যিই জেগে আছে কিনা। নিশ্চিত হয়ে সে বলল, আয় বাপধন আমার বুকে
আয়, তা আমার সে মা লক্ষী কই?
— মা লক্ষী, কে মা লক্ষী?
— কেন, আমি যাকে স্বপ্নে দেখলাম, জিনসের প্যান্ট,গেঞ্জী পরে তোর সাথে-সাথে আসছিল।
— তুমি দেখেছো?
— হ্যাঁ, দেখেছিই তো,কুকুরের ঝগড়া অব্দি দেখেছি, তুই ভয় পেয়ে কেমন সিঁটিয়ে গেলি আর
মেয়েটা কেমন সাহস ভরে হেঁটে গেল।
— তারপর?
—তারপর তো আর মনে পড়ছে না বাপধন, আসলে বয়স হয়েছে তো, দিনের কথায় সব মনে
থাকে না, তা এ -তো রাতের স্বপ্ন।
রাবেয়ার কথায় হায়দার অবাক। তার ধারণা পাড়ার কোন ফাজিল ছেলে তাকে আর রোমিলাকে
কুকুরের ঝগড়া পার হতে দেখেছে। সেই এসে খালাকে রাঙিয়ে-রাঙিয়ে বলেছে। খালা যেটা এখন
স্বপ্ন বলে চালাতে চায়ছে।
মৃদু হেসে হায়দার বলে, মা, তোমার আব্বা হাফেজ ছিল, জ্বিন নামাতে পারতো, সে-ই এসে
এসব বৃত্তান্ত দিয়ে যায় তোমাকে, তা-ই না? তা তোমার সেই জিন-চাচার কাছে দরবার কর,
ওই বদ-মেয়েটি কেন আমার সাথে শেষ পর্যন্ত এল না, কোথায় গেল।
— এই দেখ, বাপধনের আমার রাগ হয়ে গেল, আমি কি আমার জিন-চাচার কথা বলেছি?
আমি তো শুধু ভোরের স্বপ্নের কথা বলি, রাগ করিস না বাপধন, চল, হাতমুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে
নিবি, মুখচোখ একেবারে শুকনো হয়ে গেছে।
কলতলায় হাত-পা ধুতে-ধুতে হায়দারের মনে হলো, খালা হয়তো মিথ্যে বলছে না, এর আগেও
অনেকবার খালা ভোরে স্বপ্ন দেখেছে, হায়দার তার বাক্স থেকে কিভাবে, কখন, কত টাকা সরিয়েছে
সব বলে দিতে পারে খালা। কি-ভাবে পারে কে জানে।
*