ধারাবাহিক উপন্যাস “প্রচ্ছায়া”

রাত সাড়ে তিনটার দিকে সব পুলিশকে যার যার থানায় ফেরত যেতে বলা হল। হতাশা ভরা মুখ আর ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সবাই যার যার থানায় চলে গেলেন। থানায় পৌছতেই হতাশার রেশ কাটতে শুরু করল। খবর পাওয়া গেল কুড়িল চৌরাস্তার কাছাকাছি এক ডাস্টবিন থেকে ব়্যাব আহত এক তরুনীকে উদ্ধার করেছে । ব়্যাব প্রথমে ধারনা করে ছিল মেয়েটি মারা গেছে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার বলেছে, জীবিত ও জীবন সংকটাপন্ন । মেয়েটির মুখশ্রীতে আঘাত করে চেহেরা বিগড়ে দেওয়া হয়েছে। ব়্যাব ধারনা করছে, সামনে পুলিশ চেকপোস্ট দেখার পর কিলার কোনো দিশকূল না পেয়ে মেয়েটিকে ডাস্টবিনে ফেলে তড়িঘড়ি পালিয়ে গেছে। ডিআইজি সাহেব মেট্টোপলিটন হাসপাতালে গিয়ে নিশ্চিত করেছেন যে, এটাই তার মেয়ে রাত্রি। রাত্রির সুরতেহাল দেখে ডিআইজি সাহেবের স্ত্রী ফের সজ্ঞা হারিয়েছেন। রাত্রির পাশাপাশি হাসপাতালে তাকেও সেবা শশ্রুশা দেওয়া হচ্ছে ।
সকাল হতে না হতেই ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ায় খবর হল, রাজধানীতে সারা রাত পুলিশের তল্লাসী। সাধারণ মানুষ হয়রানীর শিকার। গভীর রাতে পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাসী চালিয়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরে রাতভর আকস্মিক এই তল্লাসী সম্পর্কে পুলিশ কিছু জানাতে রাজি হয় নি। ফোন করে আইজি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাওয়া যায় নি।
সকাল দশটার দিকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে লাল অক্ষরে ব্রেকিং নিউজ এল, গতকাল রাতে ডিআইজি সাহেবের মেয়ে রাত্রি হঠাত করেই নিখোঁজ হয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করতেই সারারাত ঢাকা শহরে পুলিশের ছানবিন। শেষ রাতে মুখশ্রী বিনষ্ট অবস্থায় রাত্রিকে কুড়িল চৌরাস্তার এক ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ধারনা করছে এটি কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ। পুলিশ আরো ধারনা করছে, এর আগে যে তিনজন তরুনীর মুখশ্রী বিগড়ে যাওয়া লাশ উদ্ধার করা হয়ে ছিল, সেগুলোও একই খুনীর কাজ।
খবরটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌছতেই তুলকালাম কান্ড ঘটে গেল। আমাদের দেশে সবচেয়ে সহজ ও জবাবদিহি বিহীন কাজ হচ্ছে গাড়ী ভাংচুর করা। যেন সকল অপরাধের মূলে গাড়ী, গাড়ীর ড্রাইভার, কিংবা গাড়ীর মালিক ! ইচ্ছে হলেই গাড়ীতে ঢিল ছুঁড়ে মারা যায়। গাড়ীতে ঢিল ছুঁড়ে মারার অপরাধে, ভাংচুর কিংবা গাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করার জন্যে কাউকে বিচারের সম্মুখিন হতে হয়েছে, এমন নজির এই দেশে নেই বললেই চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যতগুলো গাড়ী পাওয়া গেল, ছাত্ররা তার একটিকেও মাফ করল না, বীর বিক্রমে সবগুলোতে ভাংচুর চালাল। দুইটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে !
চারিদিকে সমালোচনার ঝড় ওঠল। টকশো-র টকারগণ বললেন, ডিআইজি সাহেবের মেয়ে নিখোঁজ হওয়াতে পুলিশ সারারাত তন্নতন্ন করে খোঁজেছে। তার আগেও তো তিন তিনজন তরুনীর মুখশ্রী বিগড়ে যাওয়া লাশ উদ্ধার হয়েছে, তখন তো পুলিশকে এত তত্পর হতে দেখা যায় নি।
সমালোচনা শোনে মনে হচ্ছে যেন পুলিশ তার দায়িত্ব পালন করেও মহাভুল করেছে। বিদেশে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করে সফল হলে, সফল রাজনীতিবিদ হতে পারলে, বৈজ্ঞানিক বা সফল গবেষক হওয়ার পর পাবলিক ফিগার বা স্টার হওয়া যায়। আর আমাদের দেশে সমালোচনা করেও অতি সহজে অনেকে স্টার বণে গেছে ! এইসব সমালোচকরা বোধ হয় সিডিউল দিয়ে সাড়তে পারে না। টেলিভিশনের রিমোটকন্ট্রোলের বোতাম টিপলে চ্যানেল বদলে কিন্তু টকশো-র টকার বদলে না ! একেক জনে দুই তিনটা চ্যানেল দখল করে বসে আছে। কথা শোনে মনে হয় এদের চেয়ে বুদ্ধিমান ও দেশপ্রেমিক লোক জগতে আর একজনও নেই ! আমাদের নেত্রীদ্বয়ের উচিত এইসব সমালোচকদেরকে ধরে ধরে মন্ত্রী বানানো, তখন মজা করে দেখা যেত এরা কী করে বা করতে পারে ।
বিকালে রাত্রির জ্ঞান ফিরল। মুখশ্রীর অবস্থা এতটাই খারাপ যে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকরা ভীড় জমিয়েছেন। রাত্রির জ্ঞান ফিরলে তার ইন্টারভিউ নেওয়া হবে। কিভাবে সে সিরিয়াল কিলারের খপ্পরে পড়ল ? কিলারকে সে চিনতে পেরেছে কি না? কিলার পুরুষ না মহিলা? ইত্যাদি ইত্যাদি। রাত্রির জ্ঞান ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে চারিদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। মহাধুমধামে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। কিন্তু হাসপাতালের সামনে পুলিশের কড়া পাহারা থাকায় সাংবাদিকগণ হাসপাতালে ঢুকতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হচ্ছেন। টেলিভিশন চ্যানেলের অনেক রিপোর্টার রাত্রির জ্ঞান ফেরার খবরটি নিজ নিজ চ্যানেলকে জানাতে শুরু করেছেন। টেলিভিশনে তা লাইভ সম্প্রচার করা হচ্ছে!
দেশে রাত্রির চিকিত্সা নিয়ে ডাক্তারগণ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে মুখে প্লাস্টিক সার্জারি করতে হবে, সেটা দেশে সম্ভব নয়। ডাক্তার আশঙ্কা প্রকাশ করুক বা না করুক, বড়লোকদের দেশের চিকিত্সার প্রতি এমনিতেও এক ধরনের এলার্জি আছে। সেই জন্যেই বোধ হয় শরীর গরম হওয়া মাত্রই তারা বিদেশের দিকে দৌড় দেয় ! সবকিছু ঠিকঠাক করে রাত্রিকে তিন দিনের মধ্যে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হল। রাত্রিকে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়ার পর ফের সমালোচনার ঝড় ওঠল, মেয়ের জবানবন্ধি না নিয়েই ডিআইজি সাহেব কেন তার মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন ? দেশে আবার যদি কোনো তরুনী সিরিয়াল কিলার নামক এই জন্তর ভয়ংকর থাবার শিকার হয়, তার দ্বায় কে নিবে? অথবা এর মধ্যে যদি সিরিয়াল কিলার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়? ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রায় তিন সপ্তাহ পর রাত্রির সঙ্গে ডিআইজি সাহেবের কথা হল। রাত্রি এখন মোটামোটি সুস্থ। ভালোভাবে কথা বলতে পারে, তবে প্লাস্টিক সার্জারি এখনো হয় নি। ডিআইজি সাহেবের স্ত্রীও মেয়ের সঙ্গে বিদেশে আছেন। ডিআইজি সাহেব নিজেও মেয়ের সঙ্গে গিয়ে ছিলেন, তবে চাকরীজনিত কারণে তাকে তড়িঘড়ি ফেরত আসতে হয়েছে। প্রতিদিন টেলিফোন মারফত তিনি মেয়ের খোঁজ খবর নেন। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। ডিআইজি সাহেব ফোন ধরেই বললেন, মা কেমন আছো ?
ওপাশ থেকে রাত্রি আহ্লাদি স্বরে বলল, ভালো। তুমি কেমন আছো বাবা ?
ডিআইজি সাহেব চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ভালো।
খানিক চুপ থেকে ডিআইজি সাহেব ফের বললেন, তোকে একটা কথা বলতে চাই মা। এই মূহুর্তে তোকে এসব কথা জিজ্ঞেস করা ঠিক হচ্ছে না যদিও, বুঝতেই পারছিস ডিপার্টমেন্টের ব্যাপার………….
এই প্রযন্ত শোনেই রাত্রি বলল, এই বিষয়ে আমি এখন কিছুই বলতে চাচ্ছি না বাবা। আগে সুস্থ হই, তারপর সব বলবো।
ডিআইজি সাহেব ফের বিনয়ের সুরে বললেন, তুই বুঝতে পারছিন মা। কিলার সে পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালাতে পারে।
খুনী দেশ ছেড়ে পালাবে না বাবা। আমি ওকে ভালো করেই চিনি।
ডিআইজি সাহেবের ফের কাকুতি, দেখো মা, তুমি বুঝতে পারছ না। স্বয়ং মন্ত্রী আমাকে……….
রাত্রি ঈষদুচ্চ স্বরে বলল, দেখো বাবা, তোমরা যদি বেশি পীড়াপিড়ি করো, তাহলে আমি কিলারের নাম ঠিকানা কিচ্ছু বলবো না।
ডিআইজি সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে অসহায়ের মতন ফোন নামিয়ে রাখলেন !