উটন দাদুর কাহিনী–পর্ব–৯(শিশু ও কিশোরদের জন্যে বনজঙ্গলের রোমাঞ্চকর উপন্যাস)
যত বুনোদের গ্রামের কাছে আসছিল ততই উটনের মনে ভয় ও উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছিল। কে জানে এ অভিযানই জীবনের শেষ কি না–এমন ভয়ঙ্কর অভিযানে এর আগে সে কখনো যায় নি। জীবনের শেষ ইচ্ছেই তো এটা ছিল। ভয়ঙ্কর কোন রোমাঞ্চকর যাত্রার জন্যে এটা ছিল তার অনেক দিনের অপেক্ষা। কিন্তু সাথের কিশোরদের তার সঙ্গে নিয়ে আসা কি উচিত হয়েছে? ওদের তো আগে জীবনের অনেকটা পথ চলার বাকি। ওদের জীবন পথের শুরুতেই যদি শেষ হয়ে যাওয়া দেখতে হয়, তা হলে তার চে বেদনাদায়ক জীবনে আর কিছু হতে পারে না ! অভিযানের ইচ্ছে তার মনে প্রাণে ছিল বটে কিন্তু তা বাস্তবে এসে এত ভয়-দায়ক হবে তা সে বুঝতে পারে নি।
যোশের মাথায় শেষে সে কতগুলি বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ঠিকই–এখন মন তার কু গাইছিল। নিজের জীবন বিপন্ন করার অধিকার তার কতটা আছে তার জানা নেই–কিন্তু নব যৌবনে পদার্পণ করতে চলেছে এমনি ছেলেদের সে যেন এক ভয়ংকরতার মাঝে ঠেলে দিয়েছে। এমনি অনেক ভাবনা উটনকে বড় ক্লান্ত করে দিচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল–আচ্ছা এখন তাদের ফিরে যাবার সময় আছে কি?
উটন তার মনের পীড়া ছেলেদের খুলে বল। কিন্তু কে কার কথা শোনে–ওরা এক কথায় নারাজ হয়ে গেল। এত দূর এসে ওরা আর ফিরে যেতে চায় না। নবজীবনের উচ্ছ্বাস তাদের যেন নব জাগরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে ! এক নেশার মত রোমাঞ্চের ভূত ওদের ওপর সওয়ার হয়ে আছে। কেউ আর থামতে চায় না। ওরা সবাই আজ উজান পথের পথিক।
কিন্তু নেচুর জীবন তো পদে পদে শঙ্কাকুল। ওকে ওরা বাঁচাবে কি ভাবে? উটনকে এ ভাবনা সব চে বেশী দুঃখ দিচ্ছিল।
নেচু সবার কথা চুপচাপ শুনছিল,তারপর ও কোথা থেকে মনের জোর পেল কে জানে! সে হঠাৎ উত্তেজনায় বসে পড়ল,বলে উঠলো–,না,আমি যাব–আমি কিছুতেই ঘরে ফিরব না—না, কিছুতেই না।
এত উত্সাহী,এত নির্ভয় ওরা কি করে হল ! উটন আশ্চর্য হল।
এও উটন দাদুর কাজ,সব সময় বীরের কহিনী–অভিযানের কাহিনী–দেশ ভক্তির গল্প,সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতার গল্প শুনে শুনে আশপাশের গ্রামের ছেলে মেয়েরা হয়ে উঠেছে সাহসী–ওরা এখন সবাই যেন একেকজন সাহসী উটন হয়ে গেছে ! ওরা কেউ এ অভিযান শেষ না করে ঘরে ফিরবে না–এমনি যেন ওদের ধনুর ভাঙা পণ !
ঠিক হল,অভিযান চালিয়ে যেতে হবে–আর পিছিয়ে যাবার কোন পথ নেই। উটন ছেলেদের জন্যে যত না ভয় পাচ্ছিল ততই ছেলেদের সাহস যেন বেড়েই যাচ্ছিল। ওদের দেহে,ওদের মনে,যেন ভরপুর সাহস ও উত্সাহ সঞ্চারিত হয়ে চলেছে।
উটন দাদুর মন থেকে ভয়ের ছায়া দূর হয়ে গেল–আর কোন নতুন চিন্তার স্থান সেখানে নেই। এখন কেবল সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে–কাসনি গ্রামের অভিযানে।
রাত শেষ হতে চলেছে—উটন ম্যাপ দেখে মোটামুটি ঠিক করে নিয়ে ছিল কাসনি গ্রামের অবস্থান সম্বন্ধে। অন্ধকারে দেখবার কিছুই নেই। সমস্ত পৃথিবী যেন ঘুমোচ্ছে। বালুচরি গ্রাম ছাড়ার পর নৌকায় কাসনি গ্রাম পৌঁছাতে নাকি প্রায় সাত,আট ঘণ্টা লেগে গিয়ে ছিলি দুগ্গুরামদের। সে আন্দাজ মত উটনরা প্রায় এসে গেছে। লবু,বনুই,শমী ওদের সবার ঘুম ভেঙে গেছে অনেকক্ষণ আগে। আগামীর ভয়ঙ্কর উত্তেজনার সময়কে মনে করে নির্ঘুম উটন বলল, এবার নাও ভিড়াতে হবে। আর কিছুটা এগোলে নদীর বাঁ দিকে কাসনি গ্রাম। তার আগের বেশ কিছুটা জাগা জুড়ে আছে ঘন জঙ্গল। কিন্তু সে জাগা আপাতত ঠাওর করা যাচ্ছে না। নৌকো নদীর কিনারা ধরে এগোচ্ছে। চুপচাপ বসে আছে নেচু,ওর শরীরে ব্যথা এখন কম। দেখেছে দৌড়োবার অবস্থায় সে নেই–তবে লেঙরে খানিক চলার ক্ষমতা থাকলেও থাকতে পারে।
উটন বলল,নেচু,তোমাকে নৌকোতেই থাকতে হবে। নৌকো ঘন জঙ্গলে রাখতে হবে–যতটা পারা যায় কাসনি গ্রাম থেকে অনেকটা দুরেই রাখতে হবে।
নদীর এ জাগা থেকে পারের জঙ্গল ক্রমশ হালকা হতে লাগলো। অন্ধকারে বোঝা না গেলেও কিছুটা ধারনা করা যাচ্ছিল। নৌকো শেষে উড়ালী নদীর এক কিনারায় ভিড়ানো হল। উটন তার টেঁক থেকে ঘড়ি বের করে ডিম করে রাখা আলোর কাছে নিয়ে দেখল রাত তখন সাড়ে তিনটে। আর এক ঘণ্টা পরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করবে–কাসনি গ্রামের মানুষখেকো লোকগুলোও জেগে উঠবে।
উটন এ গ্রামের রহন-সহন দেখতে এসেছে। সে সঙ্গে যতটা সম্ভব ওদের মধ্যে শিক্ষা,দীক্ষা,সভ্যতার আলো যতটা ভরে দেওয়া যায় ততটাই উপকার হবে ওদের–সে সঙ্গে দশের ও দেশের।
ধীরে ধীরে অন্ধকার দুরে সরে যাচ্ছিল। দারুণ উত্তেজনা নিয়ে সবাই নৌকোয় বসে আছে।
সকালের আলোয় কাসনি গ্রাম দেখা গেল না। কারণ নদীর পারে বড় গাছের সংখ্যা কম হলেও ঝোপঝাড় অনেক বেশী। তা ছাড়া নদীর তীর ধরে কিছুটা ওপরে না উঠলে কিছু দেখতে পাবার কথাও নয়। তবে হ্যাঁ,মনে হচ্ছিল লোকালয় খুব বেশী দুরে নেই। দূর থেকে মানুষের একটা দুটো কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছিল।
শামী চীৎকার করতে গিয়েও চুপ করে গেল–সে তাড়াতাড়ি উটন দাদুর কাছে গিয়ে দূরে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল,ওদের থেকে বেশী দুরে নয়–নদীর পারে এক উলঙ্গ লোক দাঁড়িয়ে আছে ! লোকটার চেহারা ঘোর কালো–মাথা ভরা ঝাঁকড়া লম্বা লম্বা চুল। দাড়ি,গোঁফের মাঝে প্রায় সারা মুখটাই যেন হারিয়ে গেছে ! ওর সমস্ত শরীরটার এখান ওখান অঢেল লোমে আবৃত। সারা শরীরে লোম আর লোম–অনেকটা লোমের পোশাকে ঢাকা মানুষের মতই তাকে দেখাচ্ছিল। পোশাক ছিল না–কিন্তু সে যেন লোম পোশাকে আবৃত। নদীর জলের দিকে তাকিয়ে ছিল লোকটা। ও কিছু যেন নদীর জলে লক্ষ্য করছিল। নৌকো থেকে সবাই দেখতে পেল ,সেই নেংটো মানুষটা হঠাৎ নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। আর মুহূর্ত পরেই ও উঠে এলো। আশ্চর্য ওর মুখে ধরা একটা মাছ–বড় মাছ ! এত দূর থেকেও মাছটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এবার ওই লোকটা জ্যান্ত মাছটা চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে লাগলো।
হঠাৎ লোকটার নজর উটনদের দিকে পড়ল। কিছু সময় থমকাল লোকটা। মনে হল ওর চোখে মুখে ভীষণ ভয়ের ছায়া ফুটে উঠেছে–ও এক ঝটকায় আড়াল হয়ে গেল–মনে হল বড় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে একবার নিজের চোখকে পরখ করে নিচ্ছে–সে যা দেখেছে তা সত্যি কি না দেখে নিচ্ছে।
উটনের হঠাৎ কি মনে হল হাত তুলে কিছু ইশারা করবার চেষ্টা করল লোকটাকে,মুখে জোরে বলে উঠলো,বাদু! বাদু ! কিন্তু তাতে ফল উল্টো হল। লোকটা ভয়ের চোটে পড়িমরি করে ছুটে ঢুকে গেল জঙ্গলের ভিতরে।
উটনের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,সর্বনাশ হল, এবার ওই লকটা ছুটে গিয়ে গ্রামে খবর দেবে।
উটন এবার ভয় পেয়ে গেল–ওদের নৌকো এখানে রাখা চলবে না–আরও দুরে কোন ঘন জঙ্গলের মাঝে ভিড়িয়ে রাখতে হবে। তা না হলে ওই বুনোরা এখনি এখানে এসে পড়বে। আর উটনদের সবাইকে ধরে নির্ঘাত বলি দিয়ে পুড়িয়ে খাবে। উটনের আরও একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল, দুগ্গল বলে ছিল,যখন খুব বিপদে পড়বে তখন সটান উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়বে। হাত দুটো সামনের দিকে মাথার সোজাসুজি প্রসারিত করে দেবে। তা হলে ওরা চট করে তোমায় মারবে না। তোমার মাঝে ভগবান ভর করেছে মনে করবে। দুগ্গল এ কথা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলে নি। দুগ্গল তার ছোট বেলায় নিজের গ্রামের কোন বয়স্ক লোকের কাছে শুনে ছিল। ও অবশ্য সে পরি-স্থিতিতে পড়ে নি–তার আগেই বুনোদের তাড়া খেয়ে ওদের চুংগল থেকে সফলতার সঙ্গে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল। যতদূর মনে পড়ে এই দুগ্গলই উটনকে বলেছিল,ওদের ভাষায়-বাদু,মানে বন্ধু। আর আমায় ক্ষমা করো,বোঝাতে গেলে দু হাঁটু মাটিতে গেঁড়ে বসে মাথা দু হাঁটুর ভাঁজে নত করে রাখতে হবে।
ক্রমশ…