ধারাবাহিক উপন্যাস “নিয়োগ পত্র” – দ্বাদশ পর্ব
দ্বাদশ পর্ব
(তের)
বাড়ীর অবস্থাটাও খুব ভালো নেই।
গোয়াল ঘরের ছাউনিটা খসে পরেছে। দু’বছর ধরে মেরামত করা হচ্ছে না। উঠোনের চেরী ফুলগাছটায় অনেক ফুল। পুরো গাছটা লাল হয়ে আছে। থোকা থোকা ফুল সব। লাউ গাছের কচি কচি ডগা গুলো মুল ঘরের টিনের ছাউনিটা ছেয়ে আছে। কয়েকটা লাউ অলস দেহ নিয়ে লুটিয়ে পরেছে চালের উপর। সামনের লিচু গাছটায় জোড়া টুনটুনি খেলা করে প্রতিদিন সকালে।
মাঘ ফাগুন মাসে পুকুরের জল শুকিয়ে যায়। নদীর জোয়ারে ভরা যৌবনের ঢেউ জাগে না। উদাস প্রকৃতি। এ বড় বিচিত্র রহস্য। জগদীশ বাবু রোজ সকালে উঠে গাছগুলোর গোড়ায় পানি দেয়। লেবু গাছগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে। লাউ গাছের কচি ডগা চালের বাইরে উকি দিচ্ছে। তার জন্য শক্ত গিল দরকার। শক্তিও যেন আগের মত নেই। বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পরেছে।
হরিমতি স্বামীকে কর্কশ ভাষায় কথা বলে। জগদীশ বাবুর কষ্ট হয়। এই বয়সে ভাবতে হচ্ছে আমি কি সংসারের বোঝা হয়ে গেলাম। প্রতি উত্তরে কর্কশ ভাষায় জবাব দিলেও মনের মধ্যে একটা ক্ষত থেকে যায়। আগে তো কখনও এমন ব্যবহার করেনি হরিমতি। জগদীশ বাবু আঙ্গুল উঁচিয়ে শুনিয়ে দেয়-আমার ছেলে বি.এ পাশ করেছে। একটা চাকরী হলে তখন দেখব তোর অহংকার কোথায় যায়।
– হাল চাষ দিয়ে সংসার চলে। আবার চাকরী। হু। রাগে নাক ছিটকে চলে যায় হরিমতি।
ভাবতে অবাক লাগে যে মানুষ সংসারের জন্য এত করলো তার কিছুই হরিমতির মনে নেই। অথচ এই বৃদ্ধ বয়সে সংসারকে কিছু দিতে না পারাটায় যেন বড় অক্ষমতা। একটা সময় ছিল যখন জগদীশ বাবুর মুখের উপর কেউ কথা বলার সাহস পায়নি। আর আজ ? জগদীশ বাবু মারা গেলে চোখের জলে বুক ভাসাবে হরিমতি। স্বামীর পায়ে শাঁখা সিঁদুর চিরতরে মুছে ফেলবে। তাতে কি লাভ। তিমির নিষেধ করে-
– মা তুমি বাবার সাথে এরকম ব্যবহার করো কেন।
– করবো নাতো কি। বুড়ো যেন শয়তানের হাড্ডি। সারাক্ষন এটা ওটা নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করে। নুন আনতে বললে বলবে-কালই তো এনেছি। এগুলো গেল কোথায়। আচ্ছা তু-ই বল। আমি কি নুন ধুয়ে জল খায়, না বাপের বাড়ী পাঠাচ্ছি। তেমনি ঘরের প্রতিটা ব্যাপারে একই কথা। আমি বলে সহ্য করছি। অন্য কেউ হলে কবে বিবাগী হয়ে যেতো।
– কিন্তু মা। সে তো বছর খানেক। এর আগে কি বাবা আমাদের জন্য সবকিছু করেনি।
– হয়েছে হয়েছে। যেমন বাপ তেমন ব্যাটা। বসে বসে খাচ্ছিস তো। বাপের কীর্ত্তন না গেয়ে আমার কীর্ত্তন গাইবি কেন। দশ মাস দশ দিন পেটে ধরেছি তো আমি। আমি কি বুঝিনা। তোরা মনে করিস আমিই সংসারে যত অশান্তির মূল।
তিমিরের কষ্ট হয়। মায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। এ পৃথিবীতে কোন কোন মায়েরাও নিশ্চয় এমনটি হয়। স্বার্থটায় সব। তিমির বাইরে এসে দাঁড়ায়। মায়ের কথাটা বিষাক্ত তীরের মত বিঁধেছে। চোখে জল আসে। পৃথিবীতে যত দুঃখ, তার বিনিময়ে একটায় সুখ। সেটা মায়ের আঁচল। তিমির বেকার না হলে এরকম সুখ থেকে কখনও বঞ্চিত হতো না। পৃথিবীর গরমিলটায় এখানে। চাইলেই দিতে হবে। না দিতে পারো তো সেখানে জগদীশ বাবুর মত কথা শুনতে হবে।
বাইরে খোলা আকাশ। কোথাও কোন মেঘ নেই। চেরী ফুলগুলোর উপর কয়েকটা প্রজাপতি ঘুরছে। শম্পা এসে হাত ধরে। তিমিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে-
– দাদা তুমি কাদঁছো। মা তোমাকে এভাবে বকলো কেন।
– দূর বোকা মেয়ে, আমি কি কচি খোকা যে মায়ের কথা শুনে কাঁদবো। তিমির বোনকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আড়ালে চোখ মুছে।
– তুমি কিন্তু এবার অনেকদিন থাকবে।
– নারে বোন। কাল সকালেই যাবো।
– মাত্র তো কাল এলে।
– কাজ আছে যে। চল যায়।
– কোথায়।
– মন্দিরের ঘাটে গিয়ে কিছুক্ষন বসি।
– চলো।
নাট মন্দিরে হরিসাধনের একটা দল সারাক্ষন তাস খেলায় মেতে থাকে। সংসারের কোন ঝক্কি ঝামেলা নেই। কেবল খেলা শেষে বাড়ী ফিরলেই স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধুদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় সে এবাড়ীর কেউ নয়। সবার গলগ্রহ হয়ে পরে আছে দু’মুটো ভাতের জন্য। সময়টাতো কাটাতে হবে। যতক্ষন মরন না হয়। প্রতিদিন ভোর হলেই আবার সেই নেশা। তাসের থুরুপ আর সিদ্ধি সেবনের অমৃত মাধুরীতে সব বেমালুম ভূলে যায়। বাড়ীর দিকে পা ফেলতেই পদচিহ্ন সংকুচিত হয়ে আসে। মাঝে মধ্যে ছোট হাত জালটা নিয়ে বের হয়। মলা ঢেলা কিছু ছোট মাছ ধরে আনে বাড়ীতে। এর বাইরে সংসারে আর কিছু দেওয়ার নেই।
আজ দলের কেউ আসেনি। হরি মাধব অসুস্থ। মন্দিরটা নির্জীব। দেবী প্রতিমা তেমনি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণ নেই অথচ আত্মার অসীম লীলা আছে। আছে মানুষের শ্রদ্ধা, ভক্তি আর ভালোবাসা। মানব অন্তরে চিরকাল চিরজাগরুক দেবীর অবস্থান। মানুষ তার জাগতিক শোকে তাপে ছুটে আসে মনের বাসনা নিবেদন করে দেবতার চরণে। দেবতা তুষ্ট হয় কিনা জানি না, তবে আত্মার সান্তনা পাওয়া যায়।
হরি কাকার মুখে শুনেছে এ দেবী সাক্ষাত জীবন্ত প্রতিমা। গভীর রাতে কোন রমনীর পায়ের নুপুরের শব্দ শোনা যায়। শান বাঁধানো ঘাট দিয়ে পুকুরে নাইতে নামে। পুকুরের জলে ঢেউ উঠে। ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দ হয়। মন্দিরের অন্ধ গহ্বরের চারিদিক অলোয় আলোকিত হয়ে উঠে। আজ পর্যন্ত এ পুকুরটার তলা কেউ দেখেনি। দেবীর ¯œানে বিঘœ ঘটবে। তাই পুকুর সেচ করা রীতিবিরুদ্ধ। এতো অবিশ্বাস্য নয়। যদি প্রশ্ন করা হয় কে দেখেছে। হরি কাকার সোজা জবাব সাধু বাবা দেখেছে। সত্যিকারের সাধক বটে। কাঁদতে কাঁদতে পাথরের মুর্তির মধ্যে প্রান সঞ্চার করতে পেরেছিল।
তিমির মন্দিরের চারপাশটা একবার ঘুরে দেখল। শম্পা ডান হাতটা ধরে পাশাপাশি হাঁটছে। জীবনের অবিন্যস্ত ভাবনাগুলো বার বার মনে জাগে। পাশাপাশি একটা পবিত্রতার ছোঁয়া লাগে। আধ্যাত্মিকতার পূত পবিত্র পরিবেশে নিজেকে সর্বত্যাগী ভাবতে ভালো লাগে। অনিত্য সংসার বন্ধন বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। পুকুর ঘাটটায় অনেক্ষন বসতে ইচ্ছে করছে তিমিরের। সন্ধ্যা নেমে এলো। পূজারী এসে সন্ধ্যা আরতি দিচ্ছে। মন্দিরের চারপাশে ঘুরে ঢং ঢং করে কাঁসা বাজিয়ে দিল ব্রাক্ষণ। তাড়া দিল শম্পা। এবারের মত উঠতে হলো।
চলবে——————-